লেখক পরিচিতি
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১২ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ – ১ নভেম্বর, ১৯৫০) ছিলেন একজন জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক। বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-মুরাতিপুর গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। পথের পাঁচালী ও অপরাজিত তাঁর সবচেয়ে বেশি পরিচিত উপন্যাস। অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আরণ্যক, চাঁদের পাহাড়, আদর্শ হিন্দু হোটেল, ইছামতী ও অশনি সংকেত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাসের পাশাপাশি বিভূতিভূষণ প্রায় ২০টি গল্পগ্রন্থ, কয়েকটি কিশোরপাঠ্য উপন্যাস ও ভ্রমণকাহিনি এবং দিনলিপিও রচনা করেন। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। বিভূতিভূষণের অধিকাংশ উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত করা হয়েছে। ১৯৫১ সালে ইছামতী উপন্যাসের জন্য বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার রবীন্দ্র পুরস্কার (মরণোত্তর) লাভ করেন।
মূলপাঠ্য — পুঁই মাচা (গল্পাংশ)
সহায়হরি চাটুজ্যে উঠানে পা দিয়াই স্ত্রীকে বলিলেন— একটা বড় বাটি কি ঘটি যা হয় কিছু দাও তো, তারক খুড়া গাছ কেটেছে, একটু ভাল রস আনি। স্ত্রী অন্নপূর্ণা খড়ের রান্নাঘরের দাওয়ায় বসিয়া শীতকালের সকালবেলা নারিকেল তেলের বোতলে ঝাঁটার কাটি পুরিয়া দুই আঙুলের সাহায্যে ঝাঁটার কাটিলগ্ন জমানো তেলটুকু সংগ্রহ করিয়া চুলে মাখাইতে ছিলেন, স্বামীকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি গায়ের কাপড় একটু টানিয়া দিলেন মাত্র, কিন্তু বাটি কি ঘটি বাহির করিয়া দিবার জন্য বিন্দুমাত্র আগ্রহ তো দেখাইলেন না, এমনকি বিশেষ কোনো কথাও বলিলেন না। সহায়হরি অগ্রবর্তী হইয়া বলিলেন— কি হয়েছে, বসে রইলে যে? দাও না একটি ঘটি?
আঃ, ক্ষেন্তি-টেন্তি সব কোথায় গেল এরা? তুমি তেল মেখে বুঝি ছোঁবে না? অন্নপূর্ণা তেলের বোতলটি সরাইয়া স্বামীর দিকে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিলেন, পরে অত্যন্ত শান্ত সুরে জিজ্ঞাসা করিলেন— তুমি মনে মনে কি ঠাউরেছ বলতে পার? স্ত্রীর অতিরিক্ত রকমের শান্ত সুরে সহায়হরির মনে ভীতির সঞ্চার হইল, ইহা যে ঝড়ের অব্যবহিত পূর্বের আকাশের স্থিরভাব মাত্র, তাহা বুঝিয়া তিনি মরিয়া হইয়া ঝড়ের প্রতীক্ষায় রহিলেন। একটু আমতা আমতা করিয়া কহিলেন— কেন… কি আবার… কি…
অন্নপূর্ণা পূর্বাপেক্ষাও শান্ত সুরে বলিলেন দেখ, রঙ কোরো না, বলছি ন্যাকামি করতে হয় অন্যসময় কোরো। তুমি কিছু জান না, কি খোঁজ রাখ না? অত বড় মেয়ে যার ঘরে, সে মাছ ধরে আর রস খেয়ে দিন কাটায় কি করে তা বলতে পার? গাঁয়ে কি গুজব রটেছে জান?
সহায়হরি আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন কেন? কি গুজব? কি গুজব জিজ্ঞাসা করো গিয়ে চৌধুরীদের বাড়ি। কেবল বাগদী দুলে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে জন্ম কাটালে ভদ্রলোকের গাঁয়ে বাস করা যায় না। সমাজে থাকতে হলে সেই রকম মেনে চলতে হয়… সহায়হরি বিস্মিত হইয়া কি বলিতে যাইতেছিলেন, অন্নপূর্ণা পূর্ববৎ সুরেই পুনর্বার বলিয়া উঠিলেন— একঘরে করবে গো, তোমাকে একঘরে করবে কাল চৌধুরীদের চণ্ডীমণ্ডপে এসব কথা হয়েছে। আমাদের হাতে ছোঁয়া জল আর কেউ খাবে না আশীর্বাদ হয়ে মেয়ের বিয়ে হলো না ও নাকি উচ্ছুগুণ্ঠ করা মেয়ে— গাঁয়ের কোন কাজে তোমাকে আর কেউ বলবে না, যাও ভালোই হয়েছে তোমার। এখন গিয়ে দুলে-বাড়ী বাগদী-বাড়ী উঠে-বসে দিন কাটাও।
সহায়হরি তাচ্ছিল্যের ভাব প্রকাশ করিয়া বলিলেন— এই। আমি বলি, না জানি কি ব্যাপার। একঘরে। সবাই একঘরে করেছেন, এবার বাকি আছেন কালীময় ঠাকুর। ওঃ! অন্নপূর্ণা তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিলেন কেন, তোমাকে একঘরে করতে বেশি কিছু লাগে, নাকি। তুমি কি সমাজের মাথা, না একজন মাতব্বর লোক? চাল নেই, চুলো নেই, এক কড়ার মুরোদ নেই, চৌধুরীরা তোমায় একঘরে করবে তা আর এমন কঠিন কথা কি? আর সত্যিই তো, এদিকে ধাড়ী মেয়ে হয়ে উঠল। হঠাৎ স্বর নামাইয়া বলিলেন হলো যে পনেরো বছরের, বাইরে কমিয়ে বলে বেড়ালে কি হবে, লোকের চোখ নেই?… পুনরায় গলা উঠাইয়া বলিলেন— না বিয়ে দেবার গা, না কিছু। আমি কি যাব পাত্র ঠিক করতে?
সশরীরে যতক্ষণ স্ত্রী সম্মুখে বর্তমান থাকিবেন, স্ত্রীর গলার সুর ততক্ষণ কমিবার কোনো সম্ভাবনা নাই বুঝিয়া সহায়হরি দাওয়া হইতে তাড়াতাড়ি একটি কাঁসার বাটি উঠাইয়া লইয়া খিড়কী দুয়ার লক্ষ্ম করিয়া যাত্রা করিলেন— কিন্তু খিড়কী দুয়ারের একটু এদিকে কি দেখিয়া হঠাৎ থামিয়া গেলেন এবং আনন্দপূর্ণস্বরে বলিয়া উঠিলেন এ সব কি রে? ক্ষেন্তি-মা, এসব কোথা থেকে আনলি? ও! এ যে…চোদ্দ-পনেরো বছরের একটি মেয়ে আর-দুটি ছোট ছোট মেয়ে পিছনে লইয়া বাড়ী ঢুকিলা তাহার হাতে এক বোঝা পুঁই শাক, ডাঁটাগুলি মোটা ও হলদে, হলদে চেহারা দেখিয়া মনে হয় কাহারা পাকা পুঁই-গাছ উপড়াইয়া ফেলিয়া উঠানের জঞ্জল তুলিয়া দিতেছিল, মেয়েটি তাহাদের উঠানের জঞ্জাল প্রাণপণে তুলিয়া আনিয়াছে। ছোট মেয়ে দুটির মধ্যে একজনের হাত খালি, অপরটির হাতে গোটা দুই-তিন পাকা পুঁই-পাতা জড়ানো কোনো দ্রব্য। বড় মেয়েটি খুব লম্বা, গোলগাল চেহারা, মাথার চুলগুলো কৃষ্ণ ও অগোছালো বাতাসে উড়িতেছে, মুখখানা খুব বড়, চোখ দুটো ডাগর ডাগর ও শান্ত। সরু সরু কাঁচের চুড়িগুলো দুপয়সা ডজনের একটি সেফটিপিন দিয়া একত্র করিয়া আটকানো। পিনটির বয়স খুঁজিতে গেলে প্রাগৈতিহাসিক যুগে গিয়া পড়িতে হয়। এই বড় মেয়েটির নামই বোধ হয় ক্ষেন্তি, কারণ সে তাড়াতাড়ি পিছন ফিরিয়া তাহার পশ্চাদ্বর্তিনীর হাত হইতে পুঁই পাতা জড়ানো দ্রব্যটি লইয়া মেলিয়া ধরিয়া বলিল— চিংড়ি মাছ, বাবা।
গয়া বুড়ীর কাছ থেকে রাস্তায় নিলাম, দিতে চায় না, বলে তোমার বাবার কাছে আর-দিনকার দরুন দুটো পয়সা বাকি আছে। আমি বললাম— দাও গয়া পিসী, আমার বাবা কি তোমার দুটো পয়সা নিয়ে পালিয়ে যাবে— আর এই পুঁই শাকগুলো ঘাটের ধারে রায় কাকা দিয়ে বললে, নিয়ে যা— কেমন মোটা মোটা…
নিয়ে যা, আহা কি ফেলে দিত… নিয়ে যা, অন্নপূর্ণা দাওয়া হইতে অত্যন্ত ঝাঁজের সহিত চিৎকার করিয়া উঠিলেন অমর্তই তোমাকে তারা দিয়েছে। পাকা পুঁইডাঁটা কাঠ হয়ে গিয়েছে, দুদিন পরে আর উনি তাদের আগাছা উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন—ভালোই হয়েছে, তাদের আর নিজেদের কষ্ট করে কাটতে হলো না যত পাথুরে বোকা সব মরতে আসে আমার ঘাড়ে… ধাড়ী মেয়ে, বলে দিয়েছি না তোমায় বাড়ীর বাইরে কোথাও পা দিও না? লজ্জা করে না এ-পাড়া সে পাড়া করে বেড়াতে! বিয়ে হলে যে চার ছেলের মা হতে? খাওয়ার নামে আর জ্ঞান থাকে না, না?… কোথায় শাক, কোথায় বেগুন আর একজন বেড়াচ্ছেন কোথায় রস, কোথায় ছাই, কোথায় পাঁশ…. ফেল বলছি ওসব… ফেল!……
মেয়েটি শান্ত অথচ ভয়মিশ্রিত দৃষ্টিতে মা’র দিকে চাহিয়া হাতের বাঁধন আলগা করিয়া দিল, পুঁই শাকের বোঝা মাটিতে পড়িয়া গেল। অন্নপূর্ণা বকিয়া চলিলেন— যা তো রাধী, ও আপদগুলো টেনে খিড়কীর পুকুরের ধারে ফেলে দিয়ে আয় তো… ফের যদি বাড়ীর বার হতে দেখেছি, তবে ঠ্যাং খোঁড়া না করি তো…। বোঝা মাটিতে পড়িয়া গিয়াছিল। ছোট মেয়েটি কলের পুতুলের মত সেগুলি তুলিয়া লইয়া খিড়কী অভিমুখে চলিল, কিন্তু ছোট মেয়ে অতবড় বোঝা আঁকড়াইতে পারিল না, অনেকগুলি ডাঁটা এদিকে ওদিকে ঝুলিতে ঝুলিতে চলিল… সহায়হরির ছেলেমেয়েরা তাহাদের মাকে অত্যন্ত ভয় করিত।
সহায়হরি আমতা আমতা করিয়া বলিতে গেলেন তা এনেছে ছেলেমানুষ খাবে বলে… তুমি আবার… বরং… পুঁইশাকের বোঝা লইয়া যাইতে যাইতে ছোট মেয়েটি ফিরিয়া দাঁড়াইয়া মার মুখের দিকে চাহিল। অন্নপূর্ণা তাহার দিকে চাহিয়া বলিলেন না না, নিয়ে যা, খেতে হবে না মেয়ে মানুষের আবার অত নোলা কিসের। এক পাড়া থেকে আর এক পাড়ায় নিয়ে আসবে দুটো পাকা পুঁইশাক ভিক্ষে করে! যা, যা… তুই যা, দূর করে বনে দিয়ে আয়…।
সহায়হরি বড় মেয়ের মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলেন, তাহার চোখ দুটা জলে ভরিয়া আসিয়াছে। তাঁর মনে বড় কষ্ট হইল কিন্তু মেয়ের যতই সাধের জিনিস হোক, পুঁই শাকের পক্ষাবলম্বন করিয়া দুপুরবেলা স্ত্রীকে চটাইতে তিনি আদৌ সাহসী হইলেন না— নিঃশব্দে খিড়কী দোর দিয়া বাহির হইয়া গেলেন-বসিয়া রাঁধিতে রাঁধিতে বড় মেয়ের মুখের কাতর দৃষ্টি স্মরণে পড়িবার সঙ্গে সঙ্গে অন্নপূর্ণার মনে পড়িল— গত অরন্ধনের পূর্বদিন বাড়ীতে পুঁই শাক রান্নার সময় ক্ষেন্তি আবদার করিয়া বলিয়াছিল— মা, অর্ধেকগুলো কিন্তু একা আমার, অর্ধেক সব মিলে তোমাদের…বাড়ীতে কেহ ছিল না, তিনি নিজে গিয়া উঠানের ও খিড়কী দোরের আশেপাশে যে ডাঁটা পড়িয়াছিল, সেগুলি কুড়াইয়া লইয়া আসিলেন— বাকিগুলা কুড়ানো যায় না, ডোবার ধারে ছাইগাদায় ফেলিয়া দিয়াছে। কুচো চিংড়ি দিয়া এইরূপে চুপিচুপিই পুঁইশাকের তরকারি রাঁধিলেন।
দুপুরবেলা ক্ষেন্তি পাতে পুঁইশাকের চচ্চড়ি দেখিয়া বিস্ময় ও আনন্দপূর্ণ ডাগর চোখে মায়ের দিকে ভয়ে ভয়ে চাহিল। দু-এক বার এদিকে ওদিকে ঘুরিয়া আসিতেই অন্নপূর্ণা দেখিলেন উক্ত পুঁইশাকের একটুকরাও তাহার পাতে পড়িয়া নাই। পুঁইশাকের উপর তাঁহার এই মেয়েটির কিরূপ লোভ তাহা তিনি জানিতেন, জিজ্ঞাসা করিলেন কিরে ক্ষেন্তি, আর একটু চচ্চড়ি দিই? ক্ষেন্তি তৎক্ষণাৎ ঘাড় নাড়িয়া এ আনন্দজনক প্রস্তাব সমর্থন করিল। কি ভাবিয়া অন্নপূর্ণার চোখে জল আসিল, চাপিতে গিয়া তিনি চোখ উঁচু করিয়া চালের বাতায় গোঁজা ডালা হইতে শুকনা লঙ্কা পাড়িতে লাগিলেন…
কালীমায়ের চণ্ডীমণ্ডপে সেদিন বৈকাল বেলা সহায়হরির ডাক পড়িল। সংক্ষিপ্ত ভূমিকা ফাঁদিবার পর কালীময় উত্তেজিত সুরে বলিলেন— সে-সব দিন কি আর আছে ভায়া? এই ধর, কেষ্ট মুখুয্যে… স্বভাব নইলে পাত্র দেব না, স্বভাব নইলে পাত্র দেব না করে কি কাণ্ডটাই করলে— অবশেষে কিনা হরির ছেলেটাকে ধরে পড়ে মেয়ের বিয়ে দেয় তবে রক্ষা। তার কি স্বভাব? রাম বলো, ছ’সাত পুরুষে ভ্রষ্ট, পচা শ্রোত্রিয়!
পরে সুর নরম করিয়া বলিলেন তা সমাজের সে-সব শাসনের দিন কি আর আছে? দিন দিন চলে যাচ্ছে। বেশি দূর যাই কেন, এই যে তোমার মেয়েটি তেরো বছরের…সহায়হরি বাধা দিয়ে বলিতে গেলেন এই শ্রাবণে তেরোয়…—আহা-হা, তেরোয় আর ষোলোয় তফাৎ কিসের শুনি? তেরোয় আর ষোলোয় তফাৎটা কিসের?আর সে তেরোই হোক, চাই যোলোই হোক, চাই পঞ্চাশই হোক, তাতে আমাদের দরকার নেই, সে তোমার হিসেব তোমার কাছে। কিন্তু পাত্র আশীর্বাদ হয়ে গেল, তুমি বেঁকে বসলে কি জন্যে শুনি? ও তো এরকম উচ্ছুগুচ্ছ করা মেয়ে।
আশীর্বাদ হওয়াও যা বিয়ে হওয়াও তা, সাত পাকের যা বাকি, এই তো!… সমাজে বসে এ-সব কাজগুলো তুমি যে করবে আর আমরা বসে বসে দেখব এ তুমি মনে ভেবো না। সমাজের বামুনদের যদি জাত মারবার ইচ্ছে না থাকে, মেয়ের বিয়ের বন্দোবস্ত করে ফেল… পাত্র পাত্র, রাজপুত্তুর না হলে পাত্র মেলে না? গরীব মানুষ, দিতে-থুতে পারবে না বলেই শ্রীমন্ত মজুমদারের ছেলেকে ঠিক করে দিলাম। লেখাপড়া নাই বা জানলো, জজ মেজেস্টার না হলে কি মানুষ হয় না? দিব্যি বাড়ী বাগান পুকুর, শুনলাম এবার নাকি কুঁড়ির জমিতে চাঁটি আমন ধানও করেছে, ব্যস-রাজার হালা দুই ভায়ের অভাব কি?…
ইতিহাসটা হইতেছে এই যে, মণিগাঁয়ের উক্ত মজুমদার মহাশয়ের পুত্রটি কালীময়ই ঠিক করিয়া দেন। কেন কালীময় মাথাব্যথা করিয়া সহায়হরির মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ মজুমদার মহাশয়ের ছেলের সঙ্গে ঠিক করিতে গেলেন তাহার কারণ নির্দেশ করিতে যাইয়া কেহ কেহ বলেন যে, কালীময় নাকি মজুমদার মহাশয়ের কাছে অনেক টাকা ধারেন, অনেকদিনের সুদ পর্যন্ত বাকি শীঘ্র নালিশ হইবে, ইত্যাদি। এ গুজব যে শুধু অবান্তর তাহাই নহে, ইহার কোন ভিত্তি আছে বলিয়াও মনে হয় না। ইহা দুষ্ট পক্ষের রটনা মাত্র। যাহাই হোক, পাত্রপক্ষ আশীর্বাদ করিয়া যাওয়ার দিন কতক পরে সহায়হরি টের পান পাত্রটি কয়েক মাস পূর্বে নিজের গ্রামে কি একটা করিবার ফলে গ্রামের এক কুন্তকারবধূর আত্মীয়-স্বজনের হাতে বেদম প্রহার খাইয়া কিছুদিন নাকি শয্যাগত ছিল। এরকম পাত্রে মেয়ে দিবার প্রস্তাব মনঃপূত না হওয়ায় সহায়হরি সে সম্বন্ধ ভাঙিয়া দেন।
দিন দুই পরের কথা। সকালে উঠিয়া সহায়হরি উঠানে বাতাবী লেবু গাছের ফাঁক দিয়া যেটুকু নিতান্ত কচি রাঙা রৌদ্র আসিয়াছিল, তাহারই আতপে বসিয়া আপন মনে তামাক টানিতেছেন। বড় মেয়ে ক্ষেন্তি আসিয়া চুপি চুপি বলিল— বাবা, যাবে না? মা ঘাটে গেল…।
সহায়হরি একবার বাড়ীর পাশে ঘাটের পথের দিকে কি জানি কেন চাহিয়া দেখিলেন, পরে নিম্নস্বরে বলিলেন— যা শিগগির, শাবলখানা নিয়ে আয় দিকি! কথা শেষ করিয়া তিনি উৎকণ্ঠার সহিত জোরে জোরে তামাক টানিতে লাগিলেন। এবং পুনরায় একবার কি জানি কেন খিড়কীর দিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। ইতিমধ্যে প্রকাণ্ড ভারী একটা লোহার শাবল দুই হাত দিয়া আঁকড়াইয়া ধরিয়া ক্ষেন্তি আসিয়া পড়িল— তৎপরে পিতা-পুত্রীতে সন্তর্পণে সম্মুখের দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেল— ইহাদের ভাব দেখিয়া মনে হইতেছিল ইহারা কাহারো ঘরে সিঁধ দিবার উদ্দেশ্যে চলিয়াছে।
অন্নপূর্ণা স্নান করিয়া সবে কাপড় ছাড়িয়া উনুন ধরাইবার যোগাড় করিতেছেন— মুখব্যে বাড়ীর ছোট খুকী দুর্গা আসিয়া বলিল— খুড়ীমা, মা বলে দিলে খুড়ীমাকে গিয়ে বল, মা ছোঁবে না তুমি আমাদের নবান্নটা মেখে আর ইঁদুর ঘটগুলো বার করে দিয়ে আসবে। সেমুখুয্যে বাড়ী ও-পাড়ায়-যাইবার পথের বাঁ ধারে এক জায়গায় শেওড়া, বনভাঁট, রাংচিতা, বনচালতা গাছের ঘন বন শীতের সকালে এক প্রকার লতাপাতার ঘন গন্ধ বন হইতে বাহির হইতেছিল। একটা লেজঝোলা হলদে পাখী আমড়া গাছের এ-ডাল হইতে ও-ডালে যাইতেছে।
দুর্গা আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিল-খুড়ীমা, খুড়ীমা, ঐ যে কেমন পাখিটা। পাখি দেখিতে গিয়া অন্নপূর্ণা কিন্তু আর একটা জিনিস লক্ষ করিলেন। ঘন বনটার মধ্যে কোথায় এতক্ষণ খুপ খুপ করিয়া আওয়াজ হইতেছিল… কে যেন কি খুঁড়িতেছে… দুর্গার কথার পরেই হঠাৎ সেটা বন্ধ হইয়া গেল। অন্নপূর্ণা সেখানে খানিকক্ষণ থমকিয়া দাঁড়াইলেন, পরে চলিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার খানিকদূর যাইতে বনের মধ্যে পুনরায় খুপ খুপ শব্দ আরম্ভ হইল। কাজ করিয়া ফিরিতে অন্নপূর্ণার কিছু বিলম্ব হইল। বাড়ী ফিরিয়া দেখিলেন, ক্ষেন্তি উঠানের রৌদ্রে বসিয়া তেলের বাটি সম্মুখে লইয়া খোঁপা খুলিতেছে। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে চাহিয়া দেখিয়া বলিলেন— এখনও নাইতে যাসনি যে, কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
ক্ষেন্তি তাড়াতাড়ি উত্তর দিল—এই যে যাই মা, এক্ষুনি যাব আর আসব।
ক্ষেন্তি স্নান করিতে যাইবার একটুখানি পরেই সহায়হরি সোৎসাহে পনেরো-ষোল সের ভারী একটা মেটে আলু ঘাড়ে করিয়া কোথা হইতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং সম্মুখে স্ত্রীকে দেখিয়া কৈফিয়তের দৃষ্টিতে সেই দিকে চাহিয়াই বলিয়া উঠিলেন ওই ও-পাড়ার ময়শা চোকিদার রোজই বলে— কর্তা-ঠাকুর, তোমার বাপ থাকতে তবু মাসে মাসে এদিকে তোমাদের পায়ের ধুলো পড়ত, তা আজকাল তো তোমরা আর আস না, এই বেড়ার গায়ে মেটে আলু করে রেখেছি, তা দাদাঠাকুর বরং…
অন্নপূর্ণা স্থির দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে চাহিয়া বলিলেন বেরোজপোতার বনের মধ্যে বসে খানিক আগে কি করছিলে শুনি?সহায়হরি অবাক হইয়া বলিলেন— আমি। না… আমি কখন? … কক্ষনো না, এই তো আমি… সহায়হরির ভাব দেখিয়া মনে হইতেছিল তিনি এইমাত্র আকাশ হইতে পড়িয়াছেন।অন্নপূর্ণা পূর্বের মতনই স্থির দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে চাহিয়া বলিলেন চুরি তো করবেই, তিন কাল গিয়েছে এক কাল আছে, মিথ্যা কথাগুলো আর এখন বোলো না। আমি সব জানি। মনে ভেবেছিলে আপদ ঘাটে গিয়েছে আর কি… দুর্গার মা ডেকে পাঠিয়েছিল, ও-পাড়ায় যাচ্ছি, শুনলাম বেরোজপোতার বনের মধ্যে কি সব খুপ খুপ শব্দ… তখনি আমি বুঝতে পেরেছি, সাড়া পেয়ে শব্দ বন্ধ হয়ে গেল, যেই আবার খানিকদূর গেলাম আবার দেখি শব্দ… তোমার তো হইকালও নেই পরকালও নেই, চুরি করতে, ডাকাতি করতে, যা করতে ইচ্ছে হয় কর কিন্তু মেয়েটাকে আবার এর মধ্যে নিয়ে গিয়ে ওর মাথা খাওয়া কিসের জন্যে?
সহায়হরি হাত নাড়িয়া, বেরোজপোতায় তাঁহার উপস্থিত থাকার বিরুদ্ধে কতকগুলি প্রমাণ উত্থাপন করিবার চেষ্টা করিতে গেলেন, কিন্তু স্ত্রীর চোখের দৃষ্টির সামনে তাঁহার বেশি কথাও যোগাইল না, বা কথিত উক্তিগুলির মধ্যে কোন পৌর্বাপর্য সম্বন্ধও খুঁজিয়া পাওয়া গেল না…
আধ ঘন্টা পরে ক্ষেন্তি স্নান সারিয়া বাড়ী ঢুকিল। সম্মুখস্থ মেটে আলুর দিকে একবার আড়চোখে চাহিয়াই নিরীহমুখে উঠানের আলনায় অত্যন্ত মনোযোগের সহিত কাপড় মেলিয়া দিতেছিল।অন্নপূর্ণা ডাকিলেন— ক্ষেন্তি, এদিকে একবার আয় তো, শুনে যা…মায়ের ডাক শুনিয়া ক্ষেন্তির মুখ শুকাইয়া গেল— সে ইতস্তত করিতে করিতে মা’র নিকটে আসিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন এই মেটে আলুটা দুজনে মিলে তুলে এনেছিস, না?ক্ষেন্তি মা’র মুখের দিকে একটুখানি চাহিয়া থাকিয়া একবার ভূপতিত মেটে আলুটার দিকে চাহিল, পরে পুনরায় মা’র মুখের দিকে চাহিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ক্ষিপ্রদৃষ্টিতে একবার বাড়ীর সম্মুখস্থ বাঁশঝাড়ের মাথার দিকেও চাহিয়া লইল; তাহার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল, কিন্তু মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না।
অন্নপূর্ণা কড়া সুরে বলিলেন কথা বলছিস নে যে বড়? এই মেটে আলু তুই এনেছিস কি না? ক্ষেন্তি বিপন্ন চোখে মা’র মুখের দিকেই চাহিয়া ছিল, উত্তর দিল— হ্যাঁ।
অন্নপূর্ণা তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিয়া বলিলেন পাজী, আজ তোমার পিঠে আমি আস্ত কাঠের চেলা ভাঙব তবে ছাড়ব, বেরোজপোতার বনে গিয়েছে মেটে আলু চুরি করতে সোমত্ত মেয়ে, বিয়ের যুগ্যি হয়ে গেছে কোন কালে, সেই একগলা বিজন বন, যার মধ্যে দিনদুপুরে বাঘ লুকিয়ে থাকে, তা মধ্যে থেকে পরের আলু নিয়ে এল তুলে? যদি গোঁসাইরা চৌকিদার ডেকে তোমায় ধরিয়ে দেয়? তোমার কোন শ্বশুর এসে তোমায় বাঁচাত? আমার জোটে খাব, না জোটে না খাব, তা বলে পরের জিনিসে হাত? এ মেয়ে নিয়ে আমি কি করব মা?
দু-তিন দিন পরে একদিন বৈকালে, ধূলামাটি মাখা হাতে ক্ষেন্তি মাকে আসিয়া বলিল— মা মা, দেখবে এস…
অন্নপূর্ণা গিয়া দেখিলেন ভাঙা পাঁচিলের ধারে যে ছোট খোলা জমিতে কতকগুলো পাথরকুচি ও কন্টিকারীর জঙ্গল হইয়াছিল, ক্ষেন্তি ছোট বোনটিকে লইয়া সেখানে মহা উৎসাহে তরকারির আওলাত করিবার আয়োজন করিতেছে এবং ভবিষ্যসম্ভাবী নানাবিধ কাল্পনিক ফলমূলের অগ্রদূত-স্বরূপ বর্তমানে কেবল একটিমাত্র শীর্ণকায় পুঁইশাকের চারা কাপড়ের ফালির গ্রন্থিবদ্ধ হইয়া ফাঁসি হইয়া যাওয়া আসামীর মতন ঊর্ধ্বমুখে একখণ্ড শুষ্ক কঞ্চির গায়ে ঝুলিয়া রহিয়াছে। ফলমূলাদির অবশিষ্টগুলি আপাতত তাঁর বড় মেয়ের মস্তিষ্কের মধ্যে অবস্থিতি করিতেছে, দিনের আলোয় এখনও বাহির হয় নাই।
অন্নপূর্ণা হাসিয়া বলিলেন— দূর পাগলী, এখন পুঁই ডাঁটার চারা পোঁতে কখনো। বর্ষাকালে পুঁততে হয়। এখন যে জল না পেয়ে মরে যাবে।
ক্ষেন্তি বলিল কেন, আমি রোজ জল ঢালব?
অন্নপূর্ণা বলিলেন দেখ, হয়তো বেঁচে যেতেও পারে। আজকাল রাতে খুব শিশির হয়। খুব শীত পড়িয়াছে। সকালে উঠিয়া সহায়হরি দেখিলেন, তাঁহার দুই ছোট মেয়ে দোলাই গায়ে বাঁধিয়া রোদ উঠিবার প্রত্যাশায় উঠানের কাঁঠালতলায় দাঁড়াইয়া আছে… একটা ভাঙা ঝুড়ি করিয়া ক্ষেন্তি শীতে কাঁপিতে কাঁপিতে মুখুয্যে বাড়ী হইতে গোবর কুড়াইয়া আনিল। সহায়হরি বলিলেন হ্যাঁ মা ক্ষেন্তি, তা সকালে উঠে জমাটা গায়ে দিতে তোর কি হয়? দেখ দিকি, এই শীত?
— আচ্ছা দিচ্ছি বাবা— কই শীত, তেমন তো…
— হ্যাঁ, দে মা, এক্ষুনি দে— অসুখ-বিসুখ পাঁচ রকম হতে পারে, বুঝলি নে?— সহায়হরি বহির হইয়া গেলেন, ভাবিতে ভাবিতে গেলেন, তিনি কি অনেক দিন মেয়ের মুখে ভালো করিয়া চাহেন নাই? ক্ষেন্তির মুখ এমন সুশ্রী হইয়া উঠিয়াছে?…
জামার ইতিহাস নিম্নলিখিত রূপ। বহু বৎসর অতীত হইল, হরিপুরের রাসের মেলা হইতে সহায়হরি কালো সার্জের এই আড়াই টাকা মূল্যের জামাটি ক্রয় করিয়া আনেন। ছিঁড়িয়া যাইবার পর তাহাতে কতবার রিফু ইত্যাদি করা হইয়াছিল, সম্প্রতি গত বৎসর হইতে ক্ষেন্তির স্বাস্থ্যোন্নতি হওয়ার দরুন জামাটি তাহার গায়ে হয় না। সংসারের এসব খোঁজ সহায়হরি রাখিতেন না। জামার বর্তমান অবস্থা অন্নপূর্ণারও জানা ছিল না ক্ষেন্তির নিজস্ব ভাঙা টিনের তোরঙ্গের মধ্যে উহা থাকিত।
পৌষ সংক্রান্তি সন্ধ্যাবেলা অন্নপূর্ণা একটি কাঁসিতে চালের গুঁড়া, ময়দা ও গুড় দিয়া চটকাইতে ছিলেন— একটা ছোট বাটিতে একবাটি তেল। ক্ষেন্তি কুরুনীর নীচে একটা কলার পাত পাড়িয়া এক থালা নারিকেল কুরিতেছে। অন্নপূর্ণা প্রথমে ক্ষেন্তির সাহায্য লইতে স্বীকৃত হন নাই, কারণ সে যেখানে সেখানে বসে, বনেবাদাড়ে ঘুরিয়া ফেরে, তাহার কাপড়চোপড় শাস্ত্রসম্মত ও শুচি নহে। অবশেষে ক্ষেন্তি নিতান্ত ধরিয়া পড়ায় হাত-পা ধোয়াইয়া ও শুচ্ছ কাপড় পরাইয়া তাহাকে বর্তমান পদে নিযুক্ত করিয়াছেন।
ময়দার গোলা মাখা শেষ হইলে অন্নপূর্ণা উনুনে খোলা চাপাইতে যাইতেছেন, ছোট মেয়ে রাধী হঠাৎ ডান হাতখানা পাতিয়া বলিল মা, ঐ একটু…
অন্নপূর্ণা বড় গামলাটা হইতে একটুখানি গোলা তুলিয়া লইয়া হাতের আঙুল পাঁচটি দ্বারা একটি বিশেষ মুদ্রা রচনা করিয়া সেটুকু রাধীর প্রসারিত হাতের উপর দিলেন, মেজমেয়ে পুঁটি অমনি ডান হাতখানা কাপড়ে তাড়াতাড়ি মুছিয়া লইয়া মা’র সামনে পাতিয়া বলিল— মা, আমায় একটু…
ক্ষেন্তি শুচিবস্ত্রে নারিকেল কুরিতে কুরিতে লুব্ধনেত্রে মধ্যে মধ্যে এদিকে চাহিতেছিল, এ সময় খাইতে চাওয়ায় মা পাছে বকে, সেই ভয়ে চুপ করিয়া রহিল।
অন্নপূর্ণা বলিলেন দেখি, নিয়ে আয় ক্ষেন্তি ঐ নারকেল মালাটা, ওতে তোর জন্য একটু রাখি। ক্ষেন্তি ক্ষিপ্র হস্তে নারিকেলের উপরের মালাখানা, যাহাতে ফুটা নাই, সেখানে সরাইয়া দিল, অন্নপূর্ণা তাহাতে একটু বেশি করিয়া গোলা ঢালিয়া দিলেন।
মেজমেয়ে পুঁটি বলিল জেঠাইমারা অনেকখানি দুধ নিয়েছে, রাঙাদিদি ক্ষীর তৈরী করছিল, ওদের অনেক রকম হবে।
ক্ষেন্তি মুখ তুলিয়া বলিল — এ-বেলা আবার হবে নাকি? ওরা তো ও-বেলা ব্রাহ্মণ নেমতন্ন করেছিল সুরেশ কাকাকে আর ও-পাড়ার তিনুর বাবাকে। ও-বেলা তো পায়েস, ঝোল-পুলি, মুগতক্তি এইসব হয়েছে।
প্রথমে এখানে অন্নপূর্ণা আদৌ ইচ্ছুক ছিলেন না, কিন্তু পাত্রটি সঙ্গতিপন্ন, শহর অঞ্চলে বাড়ী, সিলেট চুন ও ইটের ব্যবসায়ে দুপয়সা নাকি করিয়াছে — এরকম পাত্র হঠাৎ মেলাও বড় দুর্ঘটনা কিনা।
জামাইয়ের বয়স একটু বেশি, প্রথমে অন্নপূর্ণা জামাইয়ের সম্মুখে বাহির হইতে একটু সংকোচ বোধ করিতেছিলেন, পরে পাছে ক্ষেন্তির মনে কষ্ট হয় এই জন্য বরণের সময় তিনি ক্ষেন্তির সপ্তপর্ণ হস্তখানি ধরিয়া জামাইয়ের হাতে তুলিয়া দিলেন— চোখের জলে তাঁহার গলা বন্ধ হইয়া আসিল, কিছু বলিতে পারিলেন না।
বাড়ির বাহির হইয়া আমলকীতলায় বেহারারা সুবিধা করিয়া লইবার জন্য বরের পাল্কী একবার নামাইল। অন্নপূর্ণা চাহিয়া দেখিলেন, বেড়ার ধারের নীল রং-এর মেদিফুলের গুচ্ছগুলি যেখানে নত হইয়া আছে, ক্ষেন্তির কম দামের বালুচরের রাঙা চেলীর আঁচলখানা পাল্কীর বাহির হইয়া সেখানে লুটাইতেছে… তাঁর এই অত্যন্ত অগোছালো, নিতান্ত নিরীহ এবং একটু অধিক মাত্রায় ভোজনপটু মেয়েটিকে পরের ঘরে অপরিচিত মহলে পাঠাইতে তাঁর বুক উদ্বেল হইয়া উঠিতেছিল। ক্ষেন্তিকে কি অপরে ঠিক বুঝিবে?…
যাইবার সময়ে ক্ষেন্তি চোখের জলে ভাসিতে ভাসিতে সান্ত্বনার সুরে বলিয়াছিল— মা, আষাঢ় মাসেই আমাকে এনো… বাবাকে পাঠিয়ে দিও… দুটো মাস তো…
তো… ও-পাড়ার ঠানদিদি বলিলেন— তোর বাবা তোর বাড়ী যাবে কেন রে, আগে নাতি হোক— তবে
ক্ষেন্তির মুখ লজ্জায় রাঙা হইয়া উঠিল। জলভরা ডাগর চোখের উপর একটুখানি লাজুক হাসির আভা মাখাইয়া সে একগুয়েমি সুরে বলিল না, যাবে না বৈ কি!… দেখো তো কেমন না যান…
ফাল্গুন-চৈত্র মাসের বৈকালবেলা উঠানের মাচায় রৌদ্রে দেওয়া আমসত্ত্ব তুলিতে তুলিতে অন্নপূর্ণার মন হু-হু করিত… তাঁর অনাচারী লোভী মেয়েটি আজ বাড়ীতে নাই যে, কোথা হইতে বেড়াইয়া আসিয়া লজ্জাহীনার মতন হাতখানি পাতিয়া মিনতির সুরে অমনি বলিবে— মা, বলব একটা কোথা? ঐ কোণটা ছিঁড়ে একটুখানি…
এক বছরের উপর হইয়া গিয়াছে। পুনরায় আষাঢ় মাস বর্ষা বেশ নামিয়াছে। ঘরের দাওয়ায় বসিয়া সহায়হরি প্রতিবেশী বিষু সরকারের সহিত কথা বলিতেছেন। সহায়হরি তামাক সাজিতে সাজিতে বলিলেন— ও তুমি ধরে রাখ, ওরকম হবেই দাদা আমাদের অবস্থার লোকের ওর চেয়ে ভাল কি আর জুটবে?
বিষু সরকার তালপাতার চাটাইয়ের উপর উবু হইয়া বসিয়াছিলেন, দূর হইতে দেখিলে মনে হইবার কথা, তিনি রুটি করিবার জন্য ময়দা চটকাইতেছেন। গলা পরিষ্কার করিয়া বলিলেন— নাঃ, সব তো আর… তা ছাড়া আমি যা দেব নগদই দেবা… তোমার মেয়েটির হয়েছিল কি?
সহায়হরি হুকাটায় পাঁচ-ছটি টান দিয়া কাসিতে কাসিতে বলিলেন — বসন্ত হয়েছিল শুনলাম। ব্যাপার কি দাঁড়াল, বুঝলে? মেয়ে তো কিছুতে পাঠাতে চায় না। আড়াইশো আন্দাজ টাকা বাকি ছিল, বললে, ও টাকা আগে দাও, তবে মেয়ে নিয়ে যাও।
—একেবার ডামার — তারপর বললাম, টাকাটা ভায়া রুমে ক্রমে দিচ্ছি। পুজোর তত্ত্ব কম করেও ত্রিশটে টাকার ক হবে না ভেবে দেখলাম কিনা? মেয়ের নানা নিন্দে ওঠালে ছোটলোকের মেয়ের মতন চলে, হাঁড়া ঘরের মত খায় আরও কত কি। পৌষ মাসে দেখতে গেলাম, মেয়েটাকে ফেলে থাকতে পারতাম বুঝছে.. সহায়হরি হঠাৎ কথা বন্ধ করিয়া জোরে মিনিট কতক ধরিয়া হুঁকায় টান দিতে লাগিলেন। কিছুই দুজনের কোনো কথা শুনা গেল না। অল্পক্ষণ পরে বিছু সরকার বলিলেন— তারপর?
আমার স্ত্রী অত্যন্ত কান্নাকাটি করতে পৌষ মাসে দেখতে গেলাম মেয়েটার যে অবস্থা করেছে শাশুড়িটা শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগল, না জেনে শুনে ছোটলোকের সঙ্গে কটম্বিতা করলেই এরৎং দিকে চাহিয়া বলিলেন — বলি আমরা ছোটলোক কি বড়লোক তোমার তো সরকার গুড়ো জানতে বাদি হয়, যেমনি মেয়ে তেমনি বাপ, পৌষ মাসের দিনে মেয়ে দেখতে এলেন শুধু হাতে। পরে বিষু সরকারে নেই, বলি পরমেশ্বর চাটয্যের নামে নীলকিচির আমলে এ অঞ্চলে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেয়েছে— আজই না হয় আমি প্রাচীন… আভিজাত্যের গৌরবে সহায়হরি শুদ্ধস্বরে হা হা করিয়া খানিকটা শুষ্ক হাস্য করিলেন। বিছু সরকার সমর্থনসূচক একটা অস্পষ্ট শব্দ করিয়া বারকতক ঘাড় নাড়িলেন।
—তারপর ফাল্গুন মাসেই তার বসন্ত হলো। এমন চামার— বসন্ত গায়ে বেরতেই টালায় আমার এক দূর-সম্পর্কের বোন আছে, একবার কালীঘাটে পূজো দিতে এসে তার খোঁজ পেয়েছিল— তারই ওখানে ফেলে রেখে গেল। আমায় না একটা সংবাদ, না কিছু। তারা আমায় সংবাদ দেয়। তা আমি গিয়ে…—
দেখতে পাওনি? নাঃ। এমনি চামার— গহনাগুলো অসুখ অবস্থাতেই গা থেকে খুলে নিয়ে তবে টালায় পাঠিয়ে দিয়েছে।… যাক, তা চল যাওয়া যাক, বেলা গেল…চার কি ঠিক করলে?… পিঁপড়ের টোপে মুড়ির চার তো সুবিধে হবে না..
তারপর কয়েক মাস কাটিয়া গিয়াছে। আজ আবার পৌষ-পার্বণের দিন। এবার পৌষ মাসের শেষাশেষি এত শীত পড়িয়াছে যে, এরূপ শীত তাঁহারা কখনও জানে দেখেন নাই।
সন্ধ্যার সময় রান্নাঘরের মধ্যে বসিয়া অন্নপূর্ণা সরুচাকলি পিঠের জন্য চালের গুঁড়ার গোলা তৈয়ারী করিতেছেন। পুঁটি ও রাধী উনুনের পাশে বসিয়া আগুন পোহাইতেছে।
রাধী বলিতেছে— আর একটু জল দিতে হবে মা, অত ঘন করে ফেললে কেন? পুঁটি বলিল— আচ্ছা মা, ওতে একটু নুন দিলে হয় না? — ওমা দেখ মা, রাধীর দোলাই কোথায় ঝুলছে এক্ষুনি ধরে উঠবে….
অন্নপূর্ণা বলিয়া উঠিলেন— সরে এসে বোসো মা, আগুনের ঘাড়ে গিয়ে না বসলে কি আগুন পোহানো হয় না? এই দিকে আয় গোলা তৈয়ারী হইয়া গেল… খোলা আগুনে চড়াইয়া অন্নপূর্ণা গোলা ঢালিয়া মুচি দিয়া চাপিয়া ধরিলেন… দেখিতে দেখিতে মিঠে আঁচে পিঠে টোপরের মতন ফুলিয়া উঠিল।
…পুঁটি বলিল— মা, দাও, প্রথম পিঠেখানা কানাচে খাঁড়া ষষ্ঠীকে ফেলে দিয়ে আসি।
অন্নপূর্ণা বলিলেন— একা যাস নে, রাধীকে নিয়ে যা।
খুব জ্যোৎস্না উঠিয়াছিল, বাড়ীর পিছনে যাঁড়াগাছের ঝোপের মাথায় তেলাকুচা লতার থোলো থোলো সাদা ফুলের মধ্যে জ্যোৎস্না আটকিয়া রহিয়াছে…
পুঁটি ও রাধী খিড়কী দোর খুলিতেই একটা শিয়াল শুকনো পাতায় খস খস করিতে করিতে ঘন ঝোপের মধ্যে ছুটিয়া পলাইল। পুঁটি পিঠেখানা জোর করিয়া ছুড়িয়া ঝোপের মাথায় ফেলিয়া দিল। তাহার পর চারিধারের নির্জন বাঁশবনের নিস্তব্ধতায় ভয় পাইয়া ছেলেমানুষ পিছু হটিয়া আসিয়া খিড়কী— দরজার মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়া তাড়াতাড়ি দ্বার বন্ধ করিয়া দিল।
…পুঁটি ও রাধী ফিরিয়া আসিলে অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসা করিলেন— দিলি?
পুঁটি বলিল— হ্যাঁ মা, তুমি আর বছর যেখান থেকে নেবুর চারা তুলে এনেছিল সেখানে ফেলে দিলাম…
তারপর সে রাত্রে অনেকক্ষণ কাটিয়া গেল। পিঠে গড়া প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে…রাতও তখন খুব বেশি… জ্যোৎস্নার আলোয় বাড়ীর পিছনের বনে অনেকক্ষণ ধরিয়া একটা কাঠঠোকরা পাখী ঠক-র-র-র শব্দ করিতেছিল, তাহার স্বরটাও যেন ক্রমে তন্দ্রালু হইয়া পড়িতেছে… দুই বোনের খাইবার জন্য কলার পাতা চিরিতে চিরিতে পুঁটি অন্যমনস্কভাবে হঠাৎ বলিয়া উঠিল— দিদি বড় ভালবাসত…
তিনজনেই খানিকক্ষণ নির্বাক হইয়া বসিয়া রহিল, তাহার পরে তাহাদের তিনজনেরই দৃষ্টি কেমন করিয়া আপনা-আপনি উঠানের এক কোণে আবদ্ধ হইয়া পড়িল… সেখানে বাড়ির সেই লোভী মেয়েটির লোভের স্মৃতি পাতায়-পাতায় শিরায়-শিরায় জড়াইয়া তাহার কত সাধের নিজের হাতে পোঁতা পুঁইগাছটি মাচা জুড়িয়া বাড়িয়া উঠিয়াছে… বর্ষার জল ও কার্তিক মাসের শিশির লইয়া কাঁচ-কচি সবুজ ডগাগুলি মাচাতে সব ধরে নাই, মাচা হইতে বাহির হইয়া দুলিতেছে… সুপুষ্ট, নধর, প্রবর্ধমান জীবনের লাবণ্যে ভরপুর।
প্রশ্নোত্তর (Questions & Answers — সঠিক উত্তর চিহ্নিত)
- ‘পুঁইমাচা’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল— → প্রবাসীতে
- ‘পুইমাচা’ গল্পটির প্রধান চরিত্রের নাম হল— → ক্ষেন্তি
- ক্ষেন্তির বাবার নাম হল— → সহায়হরি চাটুজ্যে
- ক্ষেন্তির মায়ের নাম হল— → অন্নপূর্ণা
- “একটু ভাল রস আনি” — যাদের গাছের থেকে রস আনার কথা বলেছেন বক্তা— → তারক খুড়ো
- “একটু ভাল রস আনি” — বক্তা হল— → সহায়হরি
- ‘পুঁইমাচা’ গল্পের শুরু হয়েছে যে সময় দিয়ে— → শীতকাল
- “গাঁয়ে কি গুজব রটেছে জান?” — বক্তা হল— → অন্নপূর্ণা
- ক্ষেন্তিদের রান্নাঘর ছাওয়া ছিল— → খড় দিয়ে
- “ও নাকি উচ্ছুগুণ্ঠ করা মেয়ে” — ‘ও’ বলতে বোঝানো হয়েছে— → ক্ষেন্তিকে
- ক্ষেন্তির প্রকৃত বয়স ছিল— → পনেরো বছর
- ক্ষেন্তির হাতে ছিল— → পুঁই গাছের ডাল
- ক্ষেন্তির হাতে পড়া ছিল— → কাঁচের চুড়ি
- ক্ষেন্তির দুই বোনের নাম হল— → পুঁটি ও রাধী
- ক্ষেন্তিকে পুঁইশাক দিয়েছিল— → রায়কাকা
- “কি অমর্তই তোমাকে তারা দিয়েছে” — এখানে ‘তোমাকে’ বলতে বোঝানো হয়েছে— → ক্ষেন্তিকে
- ‘মেয়ে মানুষের আবার অত নোলা কিসের’ — বক্তা হল— → অন্নপূর্ণা
- ‘মেয়ে মানুষের আবার অত নোলা কিসের’ — ‘নোলা’ শব্দের অর্থ হল— → লালসা
- মুখুজ্যে বাড়ির ছোট খুকীর নাম হল— → দুর্গা
- “যা শিগগির শাবলখানা নিয়ে আয় দিকি” — উক্তিটির বক্তা হল— → সহায়হরি
- সহায়হরি মেটে আলু এনেছিল— → বেরোজপোতার বন থেকে
- “এই মেটে আলুটা দুজনে মিলি তুলে এনেছিস, না?” — এখানে ‘দুজন’ বলতে বোঝানো হয়েছে— → সহায়হরি ও ক্ষেন্তিকে
- “দেখ, হয়তো বেঁচে যেতেও পারে” — কার বেঁচে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে— → একটিমাত্র শীর্ণকায় পুঁইশাকের চারা
- “সকালে উঠে জামাটা গায়ে দিতে তোর কি হয়?” — উক্তিটির বক্তা হল— → সহায়হরি
- পৌষ সংক্রান্তির দিন ক্ষীর বানিয়েছিল— → রাঙাদিদি
- ক্ষেন্তিকে খুড়ীমা পাটিসাপটা খেতে দিয়েছিল— → তিনটি
- ক্ষেন্তির মা অন্নপূর্ণাদেবী পাটিসাপটা তৈরি করেন— → নারকেলের ছাঁই দিয়ে
- ক্ষেন্তির বরের বয়স ছিল— → বছর চল্লিশ
- যে মাসে ক্ষেন্তির বিবাহ হয়েছিল— → বৈশাখ মাসে
- “আষাঢ় মাসেই আমাকে এনো” — বক্তা হল— → ক্ষেন্তি
- “বাবাকে পাঠিয়ে দিও…” — বক্তা হল— → ক্ষেন্তি
- “ঐ কোণটা ছিঁড়ে একটুখানি…” — কীসের কোণা ছিঁড়ে দেবার কথা বলা হয়েছে? → আমসত্ত্ব
- “এ অঞ্চলে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেয়েছে” — বক্তা হল— → ক্ষেন্তির শাশুড়ি
- “দিদি বড় ভালবাসত” — বক্তা হল— → পুঁটি
- “মাচা হইতে বাহির হইয়া দুলিতেছে…” — কী দুলিতেছে? → পুঁই গাছ
- “এ অঞ্চলে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেয়েছে” — বক্তা হল— → ক্ষেন্তির শাশুড়ি
মিলকরণ প্রশ্ন ১
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (i) ক্ষেন্তি-অন্নপূর্ণা | (a) স্বামী-স্ত্রী |
| (ii) পুঁটি-রাধী | (b) মেয়ে-মা |
| (iii) সহায়হরি-ক্ষেন্তি | (c) বাবা-মেয়ে |
| (iv) সহায়হরি-অন্নপূর্ণা | (d) দুই বোন |
উত্তর: (i)-b, (ii)-d, (iii)-c, (iv)-a
মিলকরণ প্রশ্ন ২
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (i) ক্ষেন্তি | (a) উদাসীন |
| (ii) সহায়হরি | (b) ব্যক্তিত্বময়ী |
| (iii) বিষু সরকার | (c) হৃদয়হীন |
| (iv) অন্নপূর্ণা | (d) ভোজনপটু |
উত্তর: (i)-d, (ii)-a, (iii)-c, (iv)-b



