মহাত্মা গান্ধী:
ভারতের স্বাধীনতার রূপকার মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ১৮৬৯ সালের ২রা অক্টোবর গুজরাটের পোরবন্দরের এক মোধ বৈশ্য (বেনিয়া) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোরবন্দর রাজ্যের দেওয়ান (প্রধানমন্ত্রী)। মাতা পুতলীবাই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও নিবেদিতপ্রাণ নারী, যার নীতিপরায়ণতা ও বৈষ্ণব আদর্শ গান্ধীর শৈশবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৮৮৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে কস্তুরবা কাপাদিয়ার (কস্তুরবা গান্ধী) সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাঁদের চার সন্তান ছিল।
শৈশবে কাথিয়াবাড়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৮৮৭ সালে তিনি আহমেদাবাদ থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। পরবর্তীতে ১৮৮৮ সালে আইন (ব্যারিস্টারি) পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইংল্যান্ডে যাত্রা করেন। লণ্ডনের ‘ইনার টেম্পল’-এ কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ১৮৯১ সালে তিনি ব্যারিস্টারি পাশ করে ভারতে ফিরে আসেন এবং বোম্বে ও রাজকোটে ওকালতি শুরু করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা পর্ব: রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ (১৮৯৩ – ১৯১৪)
১৮৯৩ সালে একটি গুজরাটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘দাদা আব্দুল্লাহ অ্যান্ড কোম্পানি’-র আইনি পরামর্শক হিসেবে গান্ধীজি দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। সেখানে তিনি ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসীদের প্রতি শ্বেতাঙ্গ শাসকদের চরম বর্ণবৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হন। একটি ট্রেনে প্রথম শ্রেণীর টিকিট থাকা সত্ত্বেও কেবল এশীয় হওয়ার কারণে তাঁকে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়—এই ঘটনা তাঁর জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনায় নাটকীয় পরিবর্তন আনে।
সেখানে ভারতীয়দের মানবাধিকার সচেতন ও সংগঠিত করতে ১৮৯৪ সালে তিনি নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৬ সালে তিনি প্রথমবারের মতো অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলন বা ‘সত্যাগ্রহ’ (সত্যের প্রতি আগ্রহ বা অটল থাকা) প্রয়োগ করেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে আগমন ও জাতীয় আন্দোলন
১৯১৫ সালের ৯ই জানুয়ারী গান্ধীজি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন (এই দিনটিকে স্মরণে রেখে ভারতে ‘প্রবাসী ভারতীয় দিবস’ পালিত হয়)। ভারতে এসে তাঁর রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের পরামর্শে তিনি সমগ্র ভারত ভ্রমণ করেন এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ করেন।
১. চম্পারণ ও খেদা সত্যাগ্রহ (১৯১৭-১৯১৮)
-
চম্পারণ (১৯১৭): বিহারের চম্পারণে নীলকর সাহেবদের বর্বরোচিত অত্যাচার ও তিনকাঠিয়া প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে প্রথম জয় লাভ করেন।
-
খেদা (১৯১৮): গুজরাটের খেদায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় রাজস্ব মওকুফের দাবিতে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সহযোগিতায় আন্দোলন চালিয়ে সাফল্য অর্জন করেন।
২. অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২)
১৯১৯ সালের রাওলাট আইন এবং জালিওয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গান্ধীজি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ণ অসহযোগের ডাক দেন। স্বদেশী পণ্য গ্রহণ, বিদেশী পণ্য বর্জন এবং খাদি ও চরকার প্রচার এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একক নেতৃত্বে আসেন। তবে ১৯২২ সালে উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরায় এক সহিংস সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ নিহত হলে অহিংস নীতি বজায় রাখতে গান্ধীজি একতরফাভাবে এই জনপ্রিয় আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন।
৩. লবণ সত্যাগ্রহ ও ডান্ডি অভিযান (১৯৩০)
১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে লাহোর অধিবেশনে জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে কংগ্রেস ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর দাবি গ্রহণ করে এবং ১৯৩০ সালের ২৬শে জানুয়ারী প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৯৩০ সালের ১২ই মার্চ গান্ধীজি ব্রিটিশ সরকারের অন্যায্য লবণ করের বিরুদ্ধে আহমেদাবাদের সবরমতী আশ্রম থেকে গুজরাটের ডান্ডি উপকূল পর্যন্ত প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার (২৪১ মাইল) দীর্ঘ ঐতিহাসিক পদযাত্রা (ডান্ডি মার্চ) শুরু করেন। ৬ই এপ্রিল সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে নিজ হাতে লবণ তৈরি করে লবণ আইন ভঙ্গ করেন। এই আইন অমান্য আন্দোলনে প্রায় ৬০,০০০ ভারতীয় গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে ১৯৩১ সালে ভাইসরয় লর্ড আরউইনের সাথে গান্ধী-আরউইন চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বন্দীদের মুক্তি নিশ্চিত করা হয় এবং দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়।
৪. ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালের ৮ই আগস্ট বোম্বেতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে গান্ধীজি ঐতিহাসিক “ভারত ছাড়ো” (Quit India) আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলনে তিনি জাতিকে “করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে” (করবো অথবা মরবো) মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। এটিই ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর পরিচালিত সর্বাত্মক আন্দোলন।
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক সংস্কার
-
সত্যাগ্রহ ও অহিংসা: অহিংসাকে কেবল দুর্বলতার প্রতীক নয়, বরং সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক অস্ত্র হিসেবে তিনি গণ্য করতেন।
-
হরিজন ও অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ: সমাজের অনগ্রসর ও তথাকথিত অস্পৃশ্য মানুষদের তিনি ‘হরিজন’ (ঈশ্বরের সন্তান) নাম দেন এবং জাতপাত প্রথার বিরুদ্ধে আমৃত্যু সংগ্রাম করেন।
-
বুনিয়াদি শিক্ষা (নয়ী তালিম): তিনি শিশুকেন্দ্রিক, হস্তশিল্পভিত্তিক ও অবৈতনিক মাতৃভাষায় শিক্ষার পক্ষে সওয়াল করেন।
-
গ্রাম স্বরাজ ও স্বনির্ভরতা: গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে কুটির শিল্প ও খাদি চরকার ব্যবহারে জোর দেন।
জীবনাবসান ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হলেও দেশভাগের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা গান্ধীজিকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তিনি নোয়াখালী ও কলকাতায় দাঙ্গাবিরোধী অনশন ও শান্তি মিশন পরিচালনা করেন।
স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাস পর, ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারী নয়াদিল্লির বিড়লা হাউসে এক সন্ধ্যায় প্রার্থনা সভায় যাওয়ার পথে নাথুরাম গডসে নামক এক চরমপন্থীর গুলিতে তিনি নিহত হন। তাঁর শেষ বাক্য ছিল “হে রাম”।
সম্মাননা ও লিগ্যাসি:
-
বিশ্বজুড়ে তিনি ‘মহাত্মা’ (প্রথম এই উপাধি দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) এবং ভারতে ‘জাতির জনক’ হিসেবে সম্মানিত।
-
তাঁর জন্মদিন ২রা অক্টোবর ভারতে গান্ধী জয়ন্তী এবং বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
-
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা সহ বিশ্বের অজস্র মহান নেতা গান্ধীজির অহিংস আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন। বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন: “ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে, রক্তমাংসের তৈরি এমন একজন মানুষ সত্যি কখনো এই পৃথিবীতে হেঁটে বেড়িয়েছিলেন।”
ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন প্রধান চারটি আন্দোলন—চম্পারণ সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন—দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। নিচে এই চারটি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:
১. চম্পারণ সত্যাগ্রহ (১৯১৭)
এটি ছিল ভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চে মহাত্মা গান্ধীর প্রথম সফল সত্যাগ্রহ আন্দোলন।
প্রেক্ষাপট:
-
তিনকাঠিয়া প্রথা: বিহারের চম্পারণ জেলায় ব্রিটিশ নীলকর সাহেবরা স্থানীয় কৃষকদের তাঁদের জমির প্রতি ২০ কাঠার মধ্যে অন্তত ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে নীল চাষ করতে বাধ্য করতো।
-
শোষণ ও রাজস্বের চাপ: উনিশ শতকের শেষের দিকে জার্মানিতে কৃত্রিম নীল (Synthetic dye) আবিষ্কৃত হলে বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা কমে যায়। ফলে নীলকররা নীল চাষ বন্ধ করলেও কৃষকদের ওপর থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব, অন্যায্য কর ও জরিমানা আদায় অব্যাহত রাখে।
-
রাজকুমার শুক্লের উদ্যোগ: শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় কৃষক নেতা রাজকুমার শুক্ল ১৯১৬ সালের লখনউ কংগ্রেস অধিবেশনে গান্ধীজির সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে চম্পারণের কৃষকদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখার অনুরোধ জানান।
ফলাফল ও গুরুত্ব:
-
চম্পারণ কৃষি আইন (১৯১৮): গান্ধীজি চম্পারণে গিয়ে তদন্ত শুরু করলে ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়, কিন্তু তিনি অহিংসভাবে অবস্থান ধরে রাখেন। বাধ্য হয়ে প্রশাসন ‘চম্পারণ এগ্রারিয়ান কমিটি’ গঠন করে (গান্ধীজিও যার সদস্য ছিলেন)।
-
তিনকাঠিয়া প্রথার বিলোপ: কমিটির সুপারিশে শতবর্ষী তিনকাঠিয়া প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে রদ করা হয় এবং কৃষকদের থেকে অবৈধভাবে আদায় করা অর্থের ২৫ শতাংশ ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়।
-
রাজনৈতিক গুরুত্ব: ভারতের মাটিতে অহিংস সত্যাগ্রহের শক্তি প্রথম প্রমাণিত হয় এবং গান্ধীজি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে গণমানুষের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২. অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০ – ১৯২২)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিবাদে এটি ছিল গান্ধীজির পরিচালিত প্রথম সর্বভারতীয় গণআন্দোলন।
প্রেক্ষাপট:
-
রাওলাট আইন (১৯১৯): বিনাবিচারে ভারতীয়দের গ্রেপ্তারের এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়।
-
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯): অমৃতসরে জেনারেল ডায়ারের বর্বরোচিত নরহত্যার পর গান্ধীজি ব্রিটিশ সরকারের ওপর থেকে সমস্ত আস্থা হারান।
-
খিলাফত আন্দোলন: অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও খলিফার পদ মর্যাদাহানির প্রতিবাদে ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায় খিলাফত আন্দোলন শুরু করে। গান্ধীজি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সুযোগ হিসেবে এই আন্দোলনকে অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত করেন।
ফলাফল ও গুরুত্ব:
-
কংগ্রেসের রূপান্তর: জাতীয় কংগ্রেস উচ্চবিত্তদের আলোচনার সভা থেকে বেরিয়ে এসে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের গণসংগঠনে পরিণত হয়।
-
স্বদেশীর প্রচার: বিলাতি বস্ত্র ও পণ্য বর্জনের ফলে দেশীয় খাদি ও হস্তশিল্প প্রসার লাভ করে। ছাত্ররা সরকারি স্কুল-কলেজ এবং আইনজীবীরা আদালত বর্জন করেন।
-
আন্দোলন স্থগিত ও প্রভাব: ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরায় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দিলে ২২ জন পুলিশকর্মী মারা যান। অহিংসার নীতি রক্ষার্থে গান্ধীজি একক সিদ্ধান্তে আন্দোলন স্থগিত করেন। আন্দোলনটি কাঙ্ক্ষিত ‘স্বরাজ’ না আনলেও ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ভারতীয়দের ভয় চিরতরে দূর করে দেয়।
৩. লবণ সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০ – ১৯৩১)
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অতি প্রয়োজনীয় উপাদান ‘লবণ’-কে কেন্দ্র করে গান্ধীজি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান।
প্রেক্ষাপট:
-
সাইমন কমিশন বর্জন (১৯২৮): কোনো ভারতীয় সদস্য না থাকায় সাইমন কমিশন বর্জনের মাধ্যমে সারাদেশে নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়।
-
পূর্ণ স্বরাজের দাবি (১৯২৯): লাহোর কংগ্রেস অধিবেশনে জওহরলাল নেহেরুর সভাপতিত্বে ‘পূর্ণ স্বরাজ’ (সম্পূর্ণ স্বাধীনতা)-কে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং ১৯৩০ সালের ২৬শে জানুয়ারী প্রথম স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
-
লবণ আইন ও অন্যায্য কর: লবণ উৎপাদনে ব্রিটিশদের একচেটিয়া অধিকার ছিল এবং এতে চড়া কর আরোপ করা হতো, যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে প্রভাবিত করতো।
ফলাফল ও গুরুত্ব:
-
ঐতিহাসিক ডান্ডি মার্চ (Dandi March): ১৯৩০ সালের ১২ই মার্চ আহমেদাবাদের সবরমতী আশ্রম থেকে ৭৮ জন অনুগামী নিয়ে গান্ধীজি পদযাত্রা শুরু করেন এবং ২৪ দিনে ৩৮৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে ৬ই এপ্রিল ডান্ডি উপকূলে সমুদ্রের পানি ফুটিয়ে লবণ আইন ভঙ্গ করেন।
-
দেশব্যাপী আইন অমান্য: এই আন্দোলনের ঢেউ বাংলা, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (খান আবদুল গফ্ফর খানের নেতৃত্বে), তামিলনাড়ু সহ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। নারীদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ এই আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল।
-
গান্ধী-আরউইন চুক্তি (১৯৩১): প্রায় ৬০,০০০ ভারতীয়কে গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলন দমানো যায়নি। বাধ্য হয়ে ভাইসরয় লর্ড আরউইন গান্ধীজির সাথে সমঝোতা করেন, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে কংগ্রেসের অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়।
৪. ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম মুহূর্তে ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগে বাধ্য করতে এটি ছিল গান্ধীজির চূড়ান্ত আন্দোলন।
প্রেক্ষাপট:
-
ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা (১৯৪২): যুদ্ধোত্তর ভারতের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের প্রস্তাবসমূহ ভারতীয় নেতৃবৃন্দ প্রত্যাখ্যান করেন।
-
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট: জাপানি আক্রমণের চরম ঝুঁকি এবং ভারতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য সংকট সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
-
অবিলম্ব স্বাধীনতার দাবি: গান্ধীজি উপলব্ধি করেন যে ব্রিটিশদের ভারতে উপস্থিতিই দেশকে জাপানি আক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে, তাই তাদের অবিলম্বে ভারত ত্যাগ করা উচিত।
ফলাফল ও গুরুত্ব:
-
“করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে” (Do or Die): ১৯৪২ সালের ৮ই আগস্ট বোম্বেতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে গান্ধীজি এই ঐতিহাসিক আহ্বান জানান। ৯ই আগস্ট ভোরেই গান্ধীজি সহ সমস্ত শীর্ষনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
-
নেতৃত্বহীন গণঅভ্যুত্থান: কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বন্দি হওয়ায় আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত রূপ নেয়। মেদিনীপুরের ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’, সাতারা ও বালিয়ায় সমান্তরাল সরকার গড়ে ওঠে।
-
চূড়ান্ত বার্তা: ব্রিটিশ সরকার কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করে আন্দোলন থামালেও এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে ভারতীয়দের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেনাবল দিয়ে ভারত শাসন করা আর সম্ভব নয়। এটি ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করে।


