ভারতের ভাষা পরিবার ও বাংলা ভাষা

ইন্দো-ইউরোপীয় বা ভারতীয় আর্য ভাষাবংশ

পৃথিবীর ভাষাগুলি কয়েকটি আদি উৎস থেকে জন্মলাভ করেছে। এই আদি উৎসগুলিকে পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাবংশ বলা হয়। পৃথিবীর প্রায় চার হাজার ভাষাকে মূলীভূত সাদৃশ্যের দিক থেকে কয়েকটি ভাষাবংশে ভাগ করা হয়। এই ভাষাগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-জার্মানিক বা আর্য। কারণ এই ভাষাবংশের ভাষার প্রাচীন সাহিত্য অতি সমৃদ্ধ, এই বংশ থেকে জাত অনেকগুলি আধুনিক ভাষার (ইংরেজি, জার্মানি, ফরাসি, ইতালীয়, রুশীয়, বাংলা, হিন্দি ইত্যাদি) সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক সমৃদ্ধি বিস্ময়কর এবং এই বংশের ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর একটি বৃহত্তর সম্প্রদায় এখন পৃথিবীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি লাভ করেছে। এইসব কারণে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশটি পৃথিবীর ভাষাবংশগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

হাতের লেখা নোট (প্রশ্নোত্তর আকারে):

১) পৃথিবীর বৃহত্তম ভাষাবংশ কোনটি? → ইন্দো ইউরোপীয় ভাষা ২) ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার জন্ম কখন হয়? / আর্য ভাষাগোষ্ঠীর জন্ম কখন হয়? → আনুমানিক আড়াই হাজার খ্রিস্টপূর্ব ৩) ইন্দো ইরানীয় যে শাখা ভারতে প্রবেশ করে তার নাম কী? → ভারতীয় আর্যভাষা ৪) ভারতীয় আর্যভাষাকে কটি যুগে ভাগ করা হয় ও কী কী? ৫) প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার অপর নাম কী? ৬) ” ” ” নিদর্শন কী? ৭) মধ্যভারতীয় আর্যভাষার ” ” ” → অশোকের শিলালিপি ৮) ” ” ” অপর নাম কী? → প্রাকৃত ভাষা/পালি ৯) পালি ভাষার প্রাচীন নিদর্শন কোনটি? → অশোকের শিলালিপি

ভাষাবংশের উদ্ভব ও বিকাশ (মূল টেক্সট)

এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে আনুমানিক আড়াই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। কোনো এক অজ্ঞাত মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মধ্য ইউরোপে, আবার কারো মতে দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশে এই ভাষার জন্ম হয়। এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী মূল আর্যজাতি পরবর্তীকালে প্রধানত ভারতবর্ষ ও ইউরোপের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং মূল আর্যভাষা বা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে দশটি প্রাচীন শাখার জন্ম হয়। এই দশটি শাখার মধ্যে আনুমানিক দেড় হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইন্দো-ইরানীয় শাখাটি দ্বিবিভক্ত হয়ে একটি শাখা ভারতে এবং অন্য শাখাটি ইরান বা পারস্যে প্রবেশ করে। ভারতে যে শাখাটি প্রবেশ করে, তার নাম হয় ভারতীয় আর্যভাষা। খ্রিস্টজন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে আজ পর্যন্ত, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের বেশি সময় জুড়ে এই ভারতীয় আর্যভাষা নানা রূপে ভারতের নানা অংশে ছড়িয়ে আছে। ভারতীয় আর্যভাষার এই সাড়ে তিন হাজার বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে পরিবর্তনের লক্ষণীয় পদক্ষেপ অনুসারে তিনটি প্রধান যুগে ভাগ করা যায়—

(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (Old Indo-Aryan = OIA) (২) মধ্য ভারতীয় আর্য (Middle Indo-Aryan = MIA) (৩) নব্য ভারতীয় আর্য (New Indo-Aryan = NIA)

সারণি — ভারতীয় আর্যভাষার তিনটি যুগ

যুগ কালসীমা যুগগত নাম নিদর্শন
(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (OIA) আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বৈদিক ভাষা বা বৈদিক সংস্কৃত ভাষা বেদ, মূলত ঋগ্বেদের সংহিতা বা মন্ত্র অংশ
(২) মধ্য ভারতীয় আর্য (MIA) আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রাকৃত ভাষা, পালি ভাষা অশোকের শিলালিপি, সংস্কৃত নাটকের নারী ও নিম্নশ্রেণির পুরুষ চরিত্রের সংলাপ, প্রাকৃত ও পালি ভাষায় রচিত যথাক্রমে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, প্রাকৃতে রচিত মহাকাব্যাদি, সাহিত্যগ্রন্থ ইত্যাদি, কালিদাস প্রমুখ সাহিত্যিকদের সংস্কৃত কাব্য-নাটক
(৩) নব্য ভারতীয় আর্য (NIA) আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া, হিন্দি, মারাঠি, পাঞ্জাবি, অবধি ইত্যাদি আধুনিক ভারতীয় আর্যদের মুখের ভাষা ও সাহিত্য

বাংলা ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

পৃথিবীর সমস্ত ভাষা কয়েকটি আদি উৎস থেকে জন্মলাভ করে বিভিন্ন খানে প্রসার লাভ করেছে। এই আদি উৎসগুলি হল পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাবংশ। ভাষাবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রায় চার হাজার ভাষাকে কয়েকটি ভাষাবংশে ভাগ করেছেন। এই ভাষাবংশগুলির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ভাষাবংশ হল ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-জার্মানিক বা আর্য। এই ভাষাবংশের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে আনুমানিক আড়াই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। মধ্য ইউরোপ অথবা দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশ থেকে এই ভাষার সূত্রপাত হয় বলে ভাষাবিদরা মনে করেন। এই ভাষাবংশের অন্যতম শাখা হল ইন্দ-ইরানীয়। আনুমানিক দেড় হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই ইন্দো-ইরানীয় ভাষার শাখাটি মূলত দুটি ভাগে ভাগ হয়ে একটি শাখা ভারতে এবং অন্য শাখাটি ইরান বা পারস্যে প্রবেশ করে। ভারতে যে ভাষাগোষ্ঠী প্রবেশ করে সেটা ‘ভারতীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠী’ নামে পরিচিতা। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ভারতীয় আর্যভাষার ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে বিকাশ লাভ করে চলেছে।

তাই এই সাড়ে তিন হাজার বছরের — যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে যিশুখ্রিস্টের জন্মের পরে দু-হাজার বছর পর্যন্ত — ইতিহাসকে বিবর্তনের স্তর অনুযায়ী প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন—

(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (Old Indo-Aryan = OIA) (২) মধ্য ভারতীয় আর্য (Middle Indo-Aryan = MIA) (৩) নব্য ভারতীয় আর্য (New Indo-Aryan = NIA)

(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য: প্রাচীন ভারতীয় ভাষার কালসীমা আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত। এ যুগের আর্যভাষার নাম বলা যায় বৈদিক ভাষা বা ব্যাপক অর্থে সংস্কৃত ভাষা। কেন-না এ যুগের ভাষার মধ্যে আছে দুটি পর্যায়— বৈদিক ভাষা ও সাহিত্য এবং সংস্কৃত। এ যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নিদর্শন বেদ (ঋগ্বেদের সংহিতা, মন্ত্র অংশ) বৈদিক ছান্দস-এ লেখা। আর সংস্কৃত হল একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা।

(২) মধ্য ভারতীয় আর্য: আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার সময়সীমা। এ যুগের ভাষারূপ নানা স্তরের মধ্য দিয়ে আবর্তিত-বিবর্তিত। তাই পালি হল এই যুগের প্রথম স্তরের ভাষারূপ। পালি ভাষা সংস্কৃত ও প্রাকৃতের মাঝামাঝি একটি স্তর। এই পালিভাষার নিদর্শন রয়েছে বৌদ্ধশাস্ত্র গ্রন্থ ‘ত্রিপিটক’ এবং বুদ্ধের জীবনকাহিনি নিয়ে লেখা ‘জাতকের গল্প’ ইত্যাদি। পালি ভাষা ছাড়া মাহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, পৈশাচী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত এবং অর্ধমাগধী প্রাকৃত এবং সব ক-টির প্রাকৃত স্তরের পরে অপভ্রংশ রূপটির পরিবর্তনের মাধ্যমে অবহট্ঠ ভাষারূপ পাওয়া যায়। এ যুগের ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায় অশোকের শিলালিপি, সংস্কৃত নাটকের নারী ও নিম্নশ্রেণির চরিত্রের সংলাপে, জৈন ধর্মগ্রন্থে, কালিদাস প্রমুখ সাহিত্যিকদের সংস্কৃত কাব্য-নাটক ইত্যাদিতে।

(৩) নব্য ভারতীয় আর্য: আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত নব্য ভারতীয় আর্যভাষা স্তরের বিস্তারকাল। সুতরাং, নব্য ভারতীয় আর্যভাষা বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে বোঝায় না। কেন-না মধ্যভারতীয় আর্য নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নব্য ভারতীয় আর্য স্তরে এসে বিভিন্ন আধুনিক ভাষার জন্ম দিয়েছে, যেমন— বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, পাঞ্জাবি, অবধি, অসমিয়া, ওড়িয়া প্রভৃতি।

বাংলা ভাষার জন্ম ও পর্যায়

আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দে নব্য ভারতীয় আর্যভাষান্তরে বাংলা ভাষা জন্ম নিয়েছে। সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা প্রবহমান। তাই বাংলা ভাষার জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত, এই দীর্ঘ সময়ে বিবর্তনের ইতিহাসকে ভাষাতাত্ত্বিকগণ কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন— (১) প্রাচীন বা আদি বাংলা (OB = Old Bengali) (২) মধ্য বাংলা (MB = Middle Bengali) (৩) আধুনিক বা নব্য বাংলা (NB = New Bengali)

(১) প্রাচীন বা আদি বাংলা: প্রাচীন বাংলা ভাষাপর্বের সময়কাল আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই পর্বের বাংলা ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায় ‘চর্যাপদ’, সর্বানন্দ রচিত ‘অমরকোষ’-এর টীকায় প্রদত্ত চারশোর বেশি বাংলা প্রতিশব্দে, বৌদ্ধকবি ধর্মদাস রচিত বিদগ্ধ ‘মুখমঙ্গল’ বইয়ের দু-চারটি বাংলা কবিতায়। এ ছাড়া সেক-শুভোদয়ার উদ্ধৃত গানে ও ছড়ায় প্রাচীন বাংলার চিহ্ন রক্ষিত আছে।

তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, সঠিক বিচারে প্রাচীন বাংলার বিস্তৃতিকাল আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। আর আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ সময়সীমায় বাংলা ভাষায় রচিত কোনো নিদর্শন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আর তাই ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ — এই দেড়শো বছরকে অন্ধকার যুগ বা বন্ধ্যাযুগ বা অনুর্বর পর্ব বলা হয়ে থাকে। এটি প্রাচীন বাংলা কিংবা মধ্য বাংলা ভাষাপর্বের অন্তর্ভুক্ত নয়।

(২) মধ্য বাংলা: আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্য বাংলা ভাষাপর্বটি বিস্তৃত। প্রায় চারশো বছর এই পর্বের বাংলা ভাষার বিস্তারকাল। এই চারশো বছরের মধ্য বাংলা পর্বের সুদীর্ঘ বিস্তারকালটিকে ভাষাতাত্ত্বিকরা আবার দুটি উপপর্বে বিভক্ত করেছেন— (ক) আদি-মধ্য বাংলা এবং (খ) অন্ত্য-মধ্য বাংলা।

আদি-মধ্য বাংলা: আদি-মধ্য বাংলা ভাষাপর্বটি আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দেড়শো বছর ব্যাপী সময়কালে একটিমাত্র নিদর্শন পাওয়া গেছে—সেটি হল বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য। এ ছাড়া আর কোনো প্রামাণিক নিদর্শন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’, মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ এবং কয়েকটি মঙ্গলকাব্যকে এ পর্বের রচনা বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এই গ্রন্থগুলির ভাষা এতটাই পরিমার্জিত ও পরিবর্তিত হয়েছে যে, তাতে এগুলি এই পর্বে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অন্ত্য-মধ্য বাংলা: আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ, প্রায় ২৬০ বছর সময়কালটি হল অন্ত্য-মধ্য বাংলা ভাষাপর্ব। এ যুগের বাংলা ভাষা নানা ধারায় সমৃদ্ধ, যেমন— মঙ্গলকাব্যের বিভিন্ন ধারা (মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল প্রভৃতি), বৈষ্ণব সাহিত্য বা বৈষ্ণব পদাবলি (উল্লেখযোগ্য কবিবর্গ-চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখ), চৈতন্যজীবনী সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য (রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত), আরাকান রাজসভার কাব্য, শাক্তপদাবলি ইত্যাদি। এ ছাড়া এই পর্বের বাংলা ভাষায় বহু আরবি-ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং বাংলা বৈষ্ণব কবিতায় ব্রজবুলি ভাষার ব্যবহার হয়েছে।

(৩) আধুনিক বা নব্য বাংলা: মধ্যযুগের শেষে কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের মৃত্যু হয় ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে। বাংলা ভাষাতত্ত্ববিদগণ এই বছরটিকে মধ্যযুগের সমাপ্তি এবং আধুনিক বাংলা ভাষাপর্বের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই মোটামুটি ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান যুগ সময়টিকে আধুনিক বাংলা ভাষার সময়সীমা বলা হয়। মধ্যযুগের বাংলা ভাষার সঙ্গে আধুনিক যুগের বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য হল গদ্যরীতির ব্যবহার। মধ্যযুগে গদ্যের চল ছিল সীমিত, কেবলমাত্র চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ প্রভৃতি ক্ষেত্রে গদ্যের ব্যবহার ছিল।

আধুনিক যুগেই প্রথম সূচনা হয় সাহিত্যিক গদ্যের। আবার লেখার ভাষার সাহিত্যিক রূপটি ‘সাধুভাষা’ এবং মানুষজনের ব্যবহারের মুখের ভাষার রূপটি ‘চলিতভাষা’ নামে পরিচিত হয়। তাই বাঙালির মুখের বাংলা ভাষাই এই পর্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই যুগের বাংলা ভাষায় বহুল পরিমাণে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে; পাশাপাশি ফরাসি, পোর্তুগিজ, জার্মান, রাশিয়ান, ইতালীয় শব্দের আগমন লক্ষ করা যায়।

আধুনিক বাংলা ভাষাপর্বে বাঙালির মুখের ভাষার পাঁচটি আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষা গড়ে উঠেছে— রাঢ়ি, বরেন্দ্রী, কামরূপী বা রাজবংশী, ঝাড়খণ্ডি এবং বঙ্গালি। এই পাঁচটি উপভাষার মধ্যে গঙ্গাতীরবর্তী তথা কলকাতার নিকটবর্তী পশ্চিম বাংলার রাঢ়ি উপভাষার উপরে ভিত্তি করে শিক্ষিত জনের আদর্শ চলিত বাংলার রূপটি গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া ছন্দগত দিক থেকেও এই পর্বে সাম্প্রতিক গদ্যছন্দের ব্যবহার লক্ষণীয়।

সারণি — বাংলা ভাষার যুগবিভাগ

ভাষাযুগ/পর্ব উপপর্ব সময়কাল নিদর্শন
প্রাচীন বা আদি বাংলা আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চর্যাপদ
অন্ধকার বা বন্ধ্যা যুগ আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি
মধ্য বাংলা i. আদি-মধ্য বাংলা আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য
ii. অন্ত্য-মধ্য বাংলা আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, অনুবাদ কাব্য, চৈতন্যজীবনী সাহিত্য, শাক্তপদাবলি, আরাকান রাজসভার কাব্য, অন্নদামঙ্গল কাব্য
আধুনিক বা নব্য বাংলা আনুমানিক ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও শ্রীরামপুর মিশনারিদের লেখা, গদ্যসাহিত্য, গীতিকবিতা, পত্রকাব্য, সনেট, উপন্যাস, ছোটোগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, বাঙালির মুখের ভাষা এবং সংবাদপত্র-পত্রিকা

MCQ প্রশ্নোত্তর (উত্তর বোল্ড করা হয়েছে):

প্রশ্ন ১: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের অন্য নাম— A) আদি ইউরোপীয় B) ইন্দোস C) ইন্দো আর্য ✓ D) ইন্দো-জার্মানিক

প্রশ্ন ২: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীকে বলা হয়— A) দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী B) আর্য ভাষাগোষ্ঠী ✓ C) অনার্য ভাষাগোষ্ঠী D) অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠী

প্রশ্ন ৩: ইন্দো-ইরানীয় গোষ্ঠীর যে শাখাটি ভারতে প্রবেশ করে তার নাম— A) অস্ট্রিক B) দ্রাবিড় C) ভোট চিনা D) প্রাচীন ভারতীয় আর্য ✓

প্রশ্ন ৪: প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার নাম— A) ইরানীয় ভাষা B) অস্ট্রিক ভাষা C) দ্রাবিড় ভাষা D) বৈদিক ভাষা ✓

প্রশ্ন ৫: একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা হল— A) বাংলা B) জার্মানি C) ইংরাজি D) সংস্কৃত ✓

প্রশ্ন ৬: বৌদ্ধশাস্ত্র গ্রন্থের নাম— A) বেদ B) বাইবেল C) জেন্দ-আবেস্তা D) ত্রিপিটক ✓

প্রশ্ন ৭: পালি ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায়— A) জেন্দ-আবেস্তায় B) বাইবেলে C) ত্রিপিটক-এ ✓ D) কোরান-এ

প্রশ্ন ৮: নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাযুগের ভাষা হল— A) পালি B) বাংলা ✓ C) সংস্কৃত D) ভোট-চিনা

প্রশ্ন ৯: প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন রয়েছে— A) বেদে B) ত্রিপিটকে C) গ্রন্থসাহেবে D) চর্যাপদে ✓

ভোট-চিনীয় ভাষাবংশ

পূর্বদিকের কোনো দেশ থেকে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে ভোট-চিনা বা ভোট-চিনীয় ভাষাবংশের মানুষজন ভারতবর্ষে আসে। ভারতবর্ষে আর্যরা আসার আগেই মঙ্গোলয়েডরা প্রবেশ করে। এই মঙ্গোলয়েডদের ভাষা ছিল ভোট-চিনা। এই বংশের ভাষাগুলি এখন ব্রহ্মদেশ ও চিনের নিকটবর্তী আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং হিমালয়ের পাদদেশে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে প্রচলিত আছে। এই ভাষাবংশ থেকে বেশ কিছু শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলি হল— চা, চিলি, লুচি, লুঙ্গি প্রভৃতি। এই ভোট-চিনীয় ভাষাবংশের প্রধানত দুটি শাখা ছিল— (১) তাইচিনা এবং (২) ভোটধর্মী।

তাইচিনা: এই শাখাটি উত্তর-পূর্ব আসাম ও অরুণাচল প্রদেশের প্রান্তীয় অঞ্চলে প্রচলিত। এই শাখার ভাষা হল— আহোম।

ভোটধর্মী: এই শাখা ভারতবর্ষের হিমালয় অঞ্চলে প্রচলিত। এই শাখার ভাষাগুলি হল— বোড়ো, নাগা, গারো, আকা, মিরি, মিসমি, রাভা, ত্রিপরা, লোথা, কুকি, মিজো, মোঘ প্রভৃতি।

হাতের লেখা নোট (প্রশ্নোত্তর আকারে):

১) ভোট চিনীয় ভাষাবংশের মানুষ কোথা থেকে ভারতবর্ষে আসে? → পূর্বদিকের কোনো একটি দেশ থেকে ২) আর্যদের পূর্বে কারা ভারতে এসেছিল? → মঙ্গোলয়েডরা ৩) মঙ্গোলয়েডদের ভাষা কী ছিল? → ভোট-চিনা ৪) ভোট-চিনীয় ভাষার কটি শাখা ও কী কী? → ১) তাইচিনা ২) ভোটধর্মী ৫) তাইচিনা গোষ্ঠীর ভাষা কী? → আহোম

চার্ট — ভোট-চিনীয় ভাষাবংশ

ভোট-চিনীয় ভাষাবংশ
        |
   ┌────┴────┐
তাইচিনা      ভোটধর্মী
   |            |
আহোম প্রভৃতি   ┌──┬──┬──┬──┬──┬──┬──┐
              বোড়ো নাগা গারো মিজো আকা রাভা কুকি মিরি প্রভৃতি

ইন্দো-ইউরোপীয় বা ভারতীয় আর্য ভাষাবংশ

পৃথিবীর ভাষাগুলি কয়েকটি আদি উৎস থেকে জন্মলাভ করেছে। এই আদি উৎসগুলিকে পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাবংশ বলা হয়। পৃথিবীর প্রায় চার হাজার ভাষাকে মূলীভূত সাদৃশ্যের দিক থেকে কয়েকটি ভাষাবংশে ভাগ করা হয়। এই ভাষাগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-জার্মানিক বা আর্য। কারণ এই ভাষাবংশের ভাষার প্রাচীন সাহিত্য অতি সমৃদ্ধ, এই বংশ থেকে জাত অনেকগুলি আধুনিক ভাষার (ইংরেজি, জার্মানি, ফরাসি, ইতালীয়, রুশীয়, বাংলা, হিন্দি ইত্যাদি) সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক সমৃদ্ধি বিস্ময়কর এবং এই বংশের ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর একটি বৃহত্তর সম্প্রদায় এখন পৃথিবীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি লাভ করেছে। এইসব কারণে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশটি পৃথিবীর ভাষাবংশগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে আনুমানিক আড়াই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। কোনো এক অজ্ঞাত মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মধ্য ইউরোপে, আবার কারো মতে দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশে এই ভাষার জন্ম হয়। এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী মূল আর্যজাতি পরবর্তীকালে প্রধানত ভারতবর্ষ ও ইউরোপের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং মূল আর্যভাষা বা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে দশটি প্রাচীন শাখার জন্ম হয়। এই দশটি শাখার মধ্যে আনুমানিক দেড় হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইন্দো-ইরানীয় শাখাটি দ্বিবিভক্ত হয়ে একটি শাখা ভারতে এবং অন্য শাখাটি ইরান বা পারস্যে প্রবেশ করে। ভারতে যে শাখাটি প্রবেশ করে, তার নাম হয় ভারতীয় আর্যভাষা। খ্রিস্টজন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে আজ পর্যন্ত, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের বেশি সময় জুড়ে এই ভারতীয় আর্যভাষা নানা রূপে ভারতের নানা অংশে ছড়িয়ে আছে। ভারতীয় আর্যভাষার এই সাড়ে তিন হাজার বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে পরিবর্তনের লক্ষণীয় পদক্ষেপ অনুসারে তিনটি প্রধান যুগে ভাগ করা যায়—

(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (Old Indo-Aryan = OIA) (২) মধ্য ভারতীয় আর্য (Middle Indo-Aryan = MIA) (৩) নব্য ভারতীয় আর্য (New Indo-Aryan = NIA)

সারণি — ভারতীয় আর্যভাষার তিনটি যুগ

যুগ কালসীমা যুগগত নাম নিদর্শন
(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (OIA) আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বৈদিক ভাষা বা বৈদিক সংস্কৃত ভাষা বেদ, মূলত ঋগ্বেদের সংহিতা বা মন্ত্র অংশ
(২) মধ্য ভারতীয় আর্য (MIA) আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রাকৃত ভাষা, পালি ভাষা অশোকের শিলালিপি, সংস্কৃত নাটকের নারী ও নিম্নশ্রেণির পুরুষ চরিত্রের সংলাপ, প্রাকৃত ও পালি ভাষায় রচিত যথাক্রমে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, প্রাকৃতে রচিত মহাকাব্যাদি, সাহিত্যগ্রন্থ ইত্যাদি, কালিদাস প্রমুখ সাহিত্যিকদের সংস্কৃত কাব্য-নাটক
(৩) নব্য ভারতীয় আর্য (NIA) আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া, হিন্দি, মারাঠি, পাঞ্জাবি, অবধি ইত্যাদি আধুনিক ভারতীয় আর্যদের মুখের ভাষা ও সাহিত্য

বাংলা ভাষার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ

পৃথিবীর সমস্ত ভাষা কয়েকটি আদি উৎস থেকে জন্মলাভ করে বিভিন্ন খানে প্রসার লাভ করেছে। এই আদি উৎসগুলি হল পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাবংশ। ভাষাবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রায় চার হাজার ভাষাকে কয়েকটি ভাষাবংশে ভাগ করেছেন। এই ভাষাবংশগুলির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ভাষাবংশ হল ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-জার্মানিক বা আর্য। এই ভাষাবংশের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে আনুমানিক আড়াই হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। মধ্য ইউরোপ অথবা দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশ থেকে এই ভাষার সূত্রপাত হয় বলে ভাষাবিদরা মনে করেন। এই ভাষাবংশের অন্যতম শাখা হল ইন্দ-ইরানীয়। আনুমানিক দেড় হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই ইন্দো-ইরানীয় ভাষার শাখাটি মূলত দুটি ভাগে ভাগ হয়ে একটি শাখা ভারতে এবং অন্য শাখাটি ইরান বা পারস্যে প্রবেশ করে। ভারতে যে ভাষাগোষ্ঠী প্রবেশ করে সেটা ‘ভারতীয় আর্য ভাষাগোষ্ঠী’ নামে পরিচিতা। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ভারতীয় আর্যভাষার ইতিহাসের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে বিকাশ লাভ করে চলেছে।

তাই এই সাড়ে তিন হাজার বছরের — যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে যিশুখ্রিস্টের জন্মের পরে দু-হাজার বছর পর্যন্ত — ইতিহাসকে বিবর্তনের স্তর অনুযায়ী প্রধানত তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন—

(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (Old Indo-Aryan = OLA) (২) মধ্য ভারতীয় আর্য (Middle Indo-Aryan = MIA) (৩) নব্য ভারতীয় আর্য (New Indo-Aryan = NIA)

(১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য: প্রাচীন ভারতীয় ভাষার কালসীমা আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত। এ যুগের আর্যভাষার নাম বলা যায় বৈদিক ভাষা বা ব্যাপক অর্থে সংস্কৃত ভাষা। কেন-না এ যুগের ভাষার মধ্যে আছে দুটি পর্যায়— বৈদিক ভাষা ও সাহিত্য এবং সংস্কৃত। এ যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নিদর্শন বেদ (ঋগ্বেদের সংহিতা, মন্ত্র অংশ) বৈদিক ছান্দস-এ লেখা। আর সংস্কৃত হল একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা।

(২) মধ্য ভারতীয় আর্য: আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্য ভারতীয় আর্যভাষার সময়সীমা। এ যুগের ভাষারূপ নানা স্তরের মধ্য দিয়ে আবর্তিত-বিবর্তিত। তাই পালি হল এই যুগের প্রথম স্তরের ভাষারূপ। পালি ভাষা সংস্কৃত ও প্রাকৃতের মাঝামাঝি একটি স্তর। এই পালিভাষার নিদর্শন রয়েছে বৌদ্ধশাস্ত্র গ্রন্থ ‘ত্রিপিটক’ এবং বুদ্ধের জীবনকাহিনি নিয়ে লেখা ‘জাতকের গল্প’ ইত্যাদি। পালি ভাষা ছাড়া মাহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, পৈশাচী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত এবং অর্ধমাগধী প্রাকৃত এবং সব ক-টির প্রাকৃত স্তরের পরে অপভ্রংশ রূপটির পরিবর্তনের মাধ্যমে অবহট্ঠ ভাষারূপ পাওয়া যায়। এ যুগের ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায় অশোকের শিলালিপি, সংস্কৃত নাটকের নারী ও নিম্নশ্রেণির চরিত্রের সংলাপে, জৈন ধর্মগ্রন্থে, কালিদাস প্রমুখ সাহিত্যিকদের সংস্কৃত কাব্য-নাটক ইত্যাদিতে।

(৩) নব্য ভারতীয় আর্য: আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত নব্য ভারতীয় আর্যভাষা স্তরের বিস্তারকাল। সুতরাং, নব্য ভারতীয় আর্যভাষা বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে বোঝায় না। কেন-না মধ্যভারতীয় আর্য নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নব্য ভারতীয় আর্য স্তরে এসে বিভিন্ন আধুনিক ভাষার জন্ম দিয়েছে, যেমন— বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, পাঞ্জাবি, অবধি, অসমিয়া, ওড়িয়া প্রভৃতি।

বাংলা ভাষার জন্ম ও পর্যায়

আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দে নব্য ভারতীয় আর্যভাষান্তরে বাংলা ভাষা জন্ম নিয়েছে। সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা প্রবহমান। তাই বাংলা ভাষার জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত, এই দীর্ঘ সময়ে বিবর্তনের ইতিহাসকে ভাষাতাত্ত্বিকগণ কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন— (১) প্রাচীন বা আদি বাংলা (OB = Old Bengali) (২) মধ্য বাংলা (MB = Middle Bengali) (৩) আধুনিক বা নব্য বাংলা (NB = New Bengali)

(১) প্রাচীন বা আদি বাংলা: প্রাচীন বাংলা ভাষাপর্বের সময়কাল আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই পর্বের বাংলা ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায় ‘চর্যাপদ’, সর্বানন্দ রচিত ‘অমরকোষ’-এর টীকায় প্রদত্ত চারশোর বেশি বাংলা প্রতিশব্দে, বৌদ্ধকবি ধর্মদাস রচিত বিদগ্ধ ‘মুখমঙ্গল’ বইয়ের দু-চারটি বাংলা কবিতায়। এ ছাড়া সেক-শুভোদয়ার উদ্ধৃত গানে ও ছড়ায় প্রাচীন বাংলার চিহ্ন রক্ষিত আছে।

তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, সঠিক বিচারে প্রাচীন বাংলার বিস্তৃতিকাল আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। আর আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ সময়সীমায় বাংলা ভাষায় রচিত কোনো নিদর্শন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আর তাই ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ — এই দেড়শো বছরকে অন্ধকার যুগ বা বন্ধ্যাযুগ বা অনুর্বর পর্ব বলা হয়ে থাকে। এটি প্রাচীন বাংলা কিংবা মধ্য বাংলা ভাষাপর্বের অন্তর্ভুক্ত নয়।

(২) মধ্য বাংলা: আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্য বাংলা ভাষাপর্বটি বিস্তৃত। প্রায় চারশো বছর এই পর্বের বাংলা ভাষার বিস্তারকাল। এই চারশো বছরের মধ্য বাংলা পর্বের সুদীর্ঘ বিস্তারকালটিকে ভাষাতাত্ত্বিকরা আবার দুটি উপপর্বে বিভক্ত করেছেন— (ক) আদি-মধ্য বাংলা এবং (খ) অন্ত্য-মধ্য বাংলা।

আদি-মধ্য বাংলা: আদি-মধ্য বাংলা ভাষাপর্বটি আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দেড়শো বছর ব্যাপী সময়কালে একটিমাত্র নিদর্শন পাওয়া গেছে—সেটি হল বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য। এ ছাড়া আর কোনো প্রামাণিক নিদর্শন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’, মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ এবং কয়েকটি মঙ্গলকাব্যকে এ পর্বের রচনা বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এই গ্রন্থগুলির ভাষা এতটাই পরিমার্জিত ও পরিবর্তিত হয়েছে যে, তাতে এগুলি এই পর্বে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অন্ত্য-মধ্য বাংলা: আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ, প্রায় ২৬০ বছর সময়কালটি হল অন্ত্য-মধ্য বাংলা ভাষাপর্ব। এ যুগের বাংলা ভাষা নানা ধারায় সমৃদ্ধ, যেমন— মঙ্গলকাব্যের বিভিন্ন ধারা (মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল প্রভৃতি), বৈষ্ণব সাহিত্য বা বৈষ্ণব পদাবলি (উল্লেখযোগ্য কবিবর্গ-চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখ), চৈতন্যজীবনী সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য (রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত), আরাকান রাজসভার কাব্য, শাক্তপদাবলি ইত্যাদি। এ ছাড়া এই পর্বের বাংলা ভাষায় বহু আরবি-ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং বাংলা বৈষ্ণব কবিতায় ব্রজবুলি ভাষার ব্যবহার হয়েছে।

(৩) আধুনিক বা নব্য বাংলা: মধ্যযুগের শেষে কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের মৃত্যু হয় ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে। বাংলা ভাষাতত্ত্ববিদগণ এই বছরটিকে মধ্যযুগের সমাপ্তি এবং আধুনিক বাংলা ভাষাপর্বের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই মোটামুটি ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান যুগ সময়টিকে আধুনিক বাংলা ভাষার সময়সীমা বলা হয়। মধ্যযুগের বাংলা ভাষার সঙ্গে আধুনিক যুগের বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য হল গদ্যরীতির ব্যবহার। মধ্যযুগে গদ্যের চল ছিল সীমিত, কেবলমাত্র চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ প্রভৃতি ক্ষেত্রে গদ্যের ব্যবহার ছিল।

আধুনিক যুগেই প্রথম সূচনা হয় সাহিত্যিক গদ্যের। আবার লেখার ভাষার সাহিত্যিক রূপটি ‘সাধুভাষা’ এবং মানুষজনের ব্যবহারের মুখের ভাষার রূপটি ‘চলিতভাষা’ নামে পরিচিত হয়। তাই বাঙালির মুখের বাংলা ভাষাই এই পর্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এই যুগের বাংলা ভাষায় বহুল পরিমাণে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে; পাশাপাশি ফরাসি, পোর্তুগিজ, জার্মান, রাশিয়ান, ইতালীয় শব্দের আগমন লক্ষ করা যায়।

আধুনিক বাংলা ভাষাপর্বে বাঙালির মুখের ভাষার পাঁচটি আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষা গড়ে উঠেছে— রাঢ়ি, বরেন্দ্রী, কামরূপী বা রাজবংশী, ঝাড়খণ্ডি এবং বঙ্গালি। এই পাঁচটি উপভাষার মধ্যে গঙ্গাতীরবর্তী তথা কলকাতার নিকটবর্তী পশ্চিম বাংলার রাঢ়ি উপভাষার উপরে ভিত্তি করে শিক্ষিত জনের আদর্শ চলিত বাংলার রূপটি গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া ছন্দগত দিক থেকেও এই পর্বে সাম্প্রতিক গদ্যছন্দের ব্যবহার লক্ষণীয়।

সারণি — বাংলা ভাষার যুগবিভাগ

ভাষাযুগ/পর্ব উপপর্ব সময়কাল নিদর্শন
প্রাচীন বা আদি বাংলা আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চর্যাপদ
অন্ধকার বা বন্ধ্যা যুগ আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি
মধ্য বাংলা I. আদি-মধ্য বাংলা আনুমানিক ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য
II. অন্ত্য-মধ্য বাংলা আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আনুমানিক ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, অনুবাদ কাব্য, চৈতন্যজীবনী সাহিত্য, শাক্তপদাবলি, আরাকান রাজসভার কাব্য, অন্নদামঙ্গল কাব্য
আধুনিক বা নব্য বাংলা আনুমানিক ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও শ্রীরামপুর মিশনারিদের লেখা, গদ্যসাহিত্য, গীতিকবিতা, পত্রকাব্য, সনেট, উপন্যাস, ছোটোগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, বাঙালির মুখের ভাষা এবং সংবাদপত্র-পত্রিকা

MCQ প্রশ্নোত্তর (উত্তর বোল্ড করা হয়েছে):

প্রশ্ন ১: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের অন্য নাম— A) আদি ইউরোপীয় B) ইন্দোস C) ইন্দো আর্য ✓ D) ইন্দো-জার্মানিক

প্রশ্ন ২: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীকে বলা হয়— A) দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠী B) আর্য ভাষাগোষ্ঠী ✓ C) অনার্য ভাষাগোষ্ঠী D) অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠী

প্রশ্ন ৩: ইন্দো-ইরানীয় গোষ্ঠীর যে শাখাটি ভারতে প্রবেশ করে তার নাম— A) অস্ট্রিক B) দ্রাবিড় C) ভোট চিনা D) প্রাচীন ভারতীয় আর্য ✓

প্রশ্ন ৪: প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার নাম— A) ইরানীয় ভাষা B) অস্ট্রিক ভাষা C) দ্রাবিড় ভাষা D) বৈদিক ভাষা ✓

প্রশ্ন ৫: একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা হল— A) বাংলা B) জার্মানি C) ইংরাজি D) সংস্কৃত ✓

প্রশ্ন ৬: বৌদ্ধশাস্ত্র গ্রন্থের নাম— A) বেদ B) বাইবেল C) জেন্দ-আবেস্তা D) ত্রিপিটক ✓

প্রশ্ন ৭: পালি ভাষার নিদর্শন পাওয়া যায়— A) জেন্দ-আবেস্তায় B) বাইবেলে C) ত্রিপিটক-এ ✓ D) কোরান-এ

প্রশ্ন ৮: নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাযুগের ভাষা হল— A) পালি B) বাংলা ✓ C) সংস্কৃত D) ভোট-চিনা

প্রশ্ন ৯: প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন রয়েছে— A) বেদে B) ত্রিপিটকে C) গ্রন্থসাহেবে D) চর্যাপদে ✓

 

Scroll to Top
WordPress Store SMS Register SMSifyWoo – Send SMS Notification For WooCommerce Social Events for Videos Add-on for Easy Social Share Buttons Social Locker – plugin for WordPress Social Share – Addons for WPBakery Page Builder WordPress Plugin Social Share for Elementor WordPress Plugin Social Share Page Views AddOn – WordPress Social Share top Bar AddOn – WordPress Social Stream for WordPress — Add Facebook Youtube Instagram Feed to WordPress Social Wall Addon for UserPro