বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ : বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা (পঞ্চম অধ্যায়) PART- 1

Early Stages of Collective Action:
Characteristics and Analysis

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ (The Great Revolt of 1857)

সূচনা

পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭ খ্রি.) পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে অর্থনৈতিক শোষণ ও স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করে। এর ফলে ভারতীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।

বিদ্রোহের কারণ

রাজনৈতিক কারণ

  • লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি।
  • দেশীয় রাজ্য দখলের নীতি।
  • দেশীয় রাজাদের অধিকার হরণ।

অর্থনৈতিক কারণ

  • কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ।
  • কুটির ও হস্তশিল্পের ধ্বংস।
  • ভারতীয় সম্পদের বিদেশে পাচার।

সামরিক কারণ

  • ভারতীয় সৈন্যদের কম বেতন।
  • পদোন্নতিতে বৈষম্য।
  • ইংরেজ অফিসারদের অপমানজনক আচরণ।

প্রত্যক্ষ কারণ

  • এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহারের গুজব।
  • ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগায় সিপাহিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি।

বিদ্রোহের সূচনা

  • ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৭: বহরমপুর সেনানিবাসে প্রথম বিক্ষোভ।
  • ২৯ মার্চ ১৮৫৭: বারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের বিদ্রোহ।
  • ১০ মে ১৮৫৭: মিরাটে পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহের সূচনা।
  • পরে দিল্লি, কানপুর, লখনৌ, ঝাঁসি, গ্বালিয়র প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রধান নেতা

  • মঙ্গল পাণ্ডে — বারাকপুর।
  • বাহাদুর শাহ দ্বিতীয় — দিল্লি।
  • নানাসাহেব — কানপুর।
  • তাতিয়া টোপি — কানপুর ও গ্বালিয়র।
  • রানি লক্ষ্মীবাই — ঝাঁসি।
  • বেগম হাজরত মহল — লখনৌ।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রকৃতি

  • অনেকে একে সিপাহী বিদ্রোহ বলেছেন।
  • অনেকে একে গণবিদ্রোহ বলেছেন।
  • কার্ল মার্কস, ডাফ প্রমুখ একে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন।
  • বীর সাভারকর একে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত করেন।
  • রমেশচন্দ্র মজুমদার একে প্রথম জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মানতে চাননি।

বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ

  • নেতৃত্বের অভাব।
  • সুসংগঠিত পরিকল্পনার অভাব।
  • আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা।
  • সর্বভারতীয় গণসমর্থনের অভাব।
  • শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের সমর্থনের অভাব।
  • ব্রিটিশদের উন্নত অস্ত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
  • বিদ্রোহী নেতাদের ওপর কঠোর দমননীতি।

ফলাফল

  • ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে।
  • ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন (Government of India Act, 1858) প্রবর্তিত হয়।
  • ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যায়।
  • লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় হন।
  • ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

মহারানী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র (১৮৫৮)

  • ভারতীয়দের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি।
  • স্বত্ববিলোপ নীতি প্রত্যাহার।
  • দেশীয় রাজাদের দত্তক গ্রহণের অধিকার স্বীকার।
  • যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি।
  • দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে চুক্তি রক্ষা করার আশ্বাস।

শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব

  • অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালি বিদ্রোহকে সমর্থন করেননি।
  • তারা ব্রিটিশ শাসনকে আধুনিক শিক্ষা ও উন্নতির বাহক বলে মনে করতেন।
  • ফলে বিদ্রোহ সর্বস্তরের সমর্থন পায়নি।

উপসংহার

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রথম বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছিল। এই বিদ্রোহ পরবর্তী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

সভাসমিতির যুগ : বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

সূচনা

ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার ও শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। ভারতীয়রা উপলব্ধি করেন যে নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজনৈতিক সংগঠন গঠন এবং আন্দোলন পরিচালনা করা প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে উনিশ শতকে ভারতে বিভিন্ন সভা-সমিতির জন্ম হয়, যা পরবর্তীকালে জাতীয় আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে।

সভাসমিতির যুগের বৈশিষ্ট্য

  • ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষা করা ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।
  • ব্রিটিশ সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পেশ করা হতো।
  • সংগঠনগুলির সদস্য প্রধানত শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ ছিলেন।
  • সাধারণ ও দরিদ্র জনগণের অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত।
  • রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছিল শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদ্ধতিনির্ভর।
  • আন্দোলনের গতি ছিল ধীর ও মন্থর।
  • জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেস গঠনের পথ প্রশস্ত করে।

বিভিন্ন সভা-সমিতি

বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা (১৮৩৬ খ্রি.)

  • কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন।
  • রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জমিদার সভা (১৮৩৮ খ্রি.)

  • জমিদারদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ব্রিটিশ সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করত।

বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি (১৮৪৩ খ্রি.)

  • ভারতীয়দের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করত।
  • প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি জানাত।

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫১ খ্রি.)

  • জমিদার সভা ও বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির সংযুক্তিতে গঠিত হয়।
  • ভারতীয়দের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করে।

হিন্দুমেলা (১৮৬৭ খ্রি.)

  • নবগোপাল মিত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত।
  • জাতীয়তাবাদ ও স্বদেশপ্রেম জাগ্রত করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।

ভারতসভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭৬ খ্রি.)

  • সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত।
  • সর্বভারতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।
  • জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫ খ্রি.)

  • এ. ও. হিউমের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন।
  • স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করে।

গুরুত্ব

  • ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়।
  • জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে।
  • বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে একত্রিত করে।
  • স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।
  • ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

উপসংহার

সভাসমিতির যুগ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়। এই সময়ে গঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয়দের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে এবং পরবর্তীকালের স্বাধীনতা আন্দোলনের শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ করে।

১. পলাশীর যুদ্ধ কবে সংঘটিত হয়?
A) ১৭৫৭

২. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রধান কারণ হিসেবে কোন অস্ত্রকে ধরা হয়?
C) এনফিল্ড রাইফেল

৩. এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ সম্পর্কে কী গুজব ছড়িয়েছিল?
B) এতে গরু ও শূকরের চর্বি ছিল

৪. ১৮৫৭ সালের প্রথম বিদ্রোহ কোথায় শুরু হয়?
C) বহরমপুর

৫. মঙ্গল পাণ্ডে কবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন?
B) ২৯ মার্চ

৬. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে “সিপাহী বিদ্রোহ” বলেছেন কারা?
B) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

৭. কোন ঐতিহাসিকরা ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন?
D) উপরের সবগুলো

৮. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে ১৮৫৭ বিদ্রোহ কী ছিল না?
D) উপরের সবগুলো
(প্রথম নয়, জাতীয় নয় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামও নয়)

৯. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ফলে কী পরিবর্তন ঘটে?
C) কোম্পানির শাসনের অবসান হয়

১০. ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী শাসনভার কার হাতে যায়?
C) মহারানি ভিক্টোরিয়া

Scroll to Top