ভারতের রাজ্যভিত্তিক লোকনৃত্য: সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর
ভারতবর্ষ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির দেশ। প্রতিটি রাজ্যের মাটি, জলবায়ু, ধর্মবিশ্বাস এবং কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা সেখানকার লোকনৃত্যের রূপ ও রীতিকে গড়ে তুলেছে। নিচে রাজ্যভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ লোকনৃত্যগুলি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো, সঙ্গে রয়েছে প্রতিটি অংশের শেষে অতিরিক্ত জরুরি প্রশ্নোত্তর এবং পরীক্ষার জন্য সংক্ষিপ্ত নোটস।
১. পশ্চিমবঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতির মূল স্তম্ভ হলো ছৌ, কাঠি, বাউল, কীর্তন, যাত্রা, লানা ও আলকাপ। পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য একটি মুখোশনির্ভর যুদ্ধনৃত্য, যেখানে শরীরী ভঙ্গিমার মাধ্যমে বীররস ফুটিয়ে তোলা হয়। বাউল ও কীর্তন মূলত ভক্তিমূলক ও আধ্যাত্মিক জীবনদর্শনের প্রকাশ, যা গ্রামবাংলার ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রশ্ন: ছৌ নৃত্য কয়টি ধারায় বিভক্ত এবং কী কী?
উত্তর: ছৌ নৃত্য মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত — পুরুলিয়া ছৌ (পশ্চিমবঙ্গ), সরাইকেলা ছৌ (ঝাড়খণ্ড) ও ময়ূরভঞ্জ ছৌ (ওড়িশা)। প্রতিটি ধারার মুখোশ ও পরিবেশনরীতি কিছুটা আলাদা।
নোটস:
- ছৌ নৃত্যকে ২০১০ সালে ইউনেস্কো ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ তালিকাভুক্ত করে।
- বাউল গান ও নৃত্য একতারা ও দোতারার সঙ্গে পরিবেশিত হয়।
২. মহারাষ্ট্র
মহারাষ্ট্রের লোকসংস্কৃতিতে কথাকীর্তন, ডান্ডিয়া, তামাশা, গাফা, লেজিন, দহিকলা, লাবণী, মৌনী, দশাবতার ও পাভরি নাচ উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। লাবণী ও তামাশা মূলত থিয়েটারধর্মী পরিবেশনা, যা ঢোলকের দ্রুত তালে পরিবেশিত হয়। দশাবতার নৃত্যটি বিষ্ণুর দশ অবতারের পৌরাণিক আখ্যান নিয়ে গড়ে ওঠে।
প্রশ্ন: লাবণী নৃত্যের বিষয়বস্তু সাধারণত কী নিয়ে হয়?
উত্তর: লাবণী নৃত্যের গানে সাধারণত সামাজিক, রাজনৈতিক ও রোমান্টিক বিষয় স্থান পায়, এবং এটি মূলত নারী শিল্পীদের দ্বারা পরিবেশিত হয়।
নোটস:
- ‘তামাশা’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ বিনোদন বা প্রদর্শনী।
- দহিকলা নৃত্য জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দহি-হাঁড়ি ভাঙার উৎসবের সঙ্গে যুক্ত।
৩. কর্ণাটক
কর্ণাটকের প্রধান লোকনৃত্যগুলির মধ্যে হুট্টারি, যক্ষগণ, সামি কুনিথা ও ডোলু কুনিথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যক্ষগণ একটি সমৃদ্ধ নৃত্য-নাট্য ধারা, যেখানে ভারী মেকআপ ও পোশাকের মাধ্যমে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি মঞ্চস্থ হয়। ডোলু কুনিথা একটি ড্রাম-নৃত্য যা ধর্মীয় উৎসবের অঙ্গ হিসেবে পরিবেশিত হয়।
প্রশ্ন: যক্ষগণ পরিবেশনায় কোন কোন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: যক্ষগণে সাধারণত চণ্ডে (এক ধরনের ঢোল), মাদল, তাল ও হারমোনিয়াম ব্যবহৃত হয়, যা পরিবেশনার নাটকীয়তা বাড়িয়ে তোলে।
নোটস:
- যক্ষগণ কর্ণাটকের উপকূলীয় জেলা যেমন উডুপি ও দক্ষিণ কন্নড়ে বেশি প্রচলিত।
- হুট্টারি নৃত্য কোদাগু সম্প্রদায়ের ফসল কাটার উৎসবের সঙ্গে যুক্ত।
৪. কেরালা
কেরালার লোকনৃত্যের মধ্যে কাইকোট্টিকালি, কালিয়াট্টাম ও তাপ্পাতিক্কালি বিশেষভাবে পরিচিত। কালিয়াট্টাম একটি প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানিক নৃত্য, যা ওনাম বা বড় উৎসবে মন্দিরপ্রাঙ্গণে পরিবেশিত হয়। এই নৃত্যগুলির ছন্দ কথাকলির সঙ্গে কিছুটা সাযুজ্যপূর্ণ।
প্রশ্ন: কাইকোট্টিকালি নৃত্য কারা এবং কখন পরিবেশন করেন?
উত্তর: কাইকোট্টিকালি মূলত মহিলাদের দ্বারা ওনাম উৎসবের সময় বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে পরিবেশিত একটি নৃত্য।
নোটস:
- ‘কালিয়াট্টাম’ শব্দের অর্থ ‘কালীর নাচ’, যা দেবী কালীর আরাধনার সঙ্গে যুক্ত।
- কেরালার ধ্রুপদী নৃত্য কথাকলির সঙ্গে লোকনৃত্যের প্রভাব লক্ষণীয়।
৫. তামিলনাড়ু
তামিলনাড়ুর কোলাটম, কুম্মি, কাভাডি, কারাগাম ও কামান্ডি নৃত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোলাটম হলো লাঠি নৃত্য, যেখানে মহিলারা বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে ছোট কাঠের লাঠি ঠুকে ছন্দ তৈরি করেন। কাভাডি নৃত্য ভগবান মুরুগানের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত একটি ভক্তিমূলক পরিবেশনা।
প্রশ্ন: কারাগাম নৃত্যে নর্তকরা মাথায় কী বহন করেন?
উত্তর: কারাগাম নৃত্যে নর্তকরা মাথায় জলপূর্ণ সুসজ্জিত ঘট (করাগাম) ভারসাম্য রেখে নাচেন, যা দেবী মারিয়াম্মানের আরাধনার অংশ।
নোটস:
- কাভাডি নৃত্য থাইপুসম উৎসবে বিশেষভাবে দেখা যায়।
- কুম্মি নৃত্য কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই শুধু হাততালির মাধ্যমে পরিবেশিত হয়।
৬. ওড়িশা
ওড়িশার ঘুমারা সঞ্চার, ছাদিয়া ড্যানডানাটা, ছৌ, নাসনি ও গোটি পুয়া নৃত্য বিশেষভাবে পরিচিত। গোটি পুয়া নৃত্যে অল্পবয়সী ছেলেরা মহিলাদের পোশাকে জগন্নাথদেবের উদ্দেশ্যে জটিল শারীরিক কসরত-সহ নৃত্য পরিবেশন করে। ময়ূরভঞ্জ অঞ্চলে ছৌ নৃত্যও যথেষ্ট জনপ্রিয়।
প্রশ্ন: গোটি পুয়া নৃত্যের সঙ্গে ওড়িশি নৃত্যের কী সম্পর্ক?
উত্তর: গোটি পুয়া নৃত্যকে ওড়িশি ধ্রুপদী নৃত্যের পূর্বসূরি হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ ওড়িশির অনেক মুদ্রা ও ভঙ্গিমা এই লোকনৃত্য থেকে এসেছে।
নোটস:
- গোটি পুয়া নৃত্যশিল্পীদের সাধারণত পুরীর মন্দির-কেন্দ্রিক আখড়ায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
- ময়ূরভঞ্জ ছৌ-তে মুখোশ ব্যবহৃত হয় না, যা পুরুলিয়া ছৌ থেকে এটিকে আলাদা করে।
৭. অসম
অসমের বিহু, রাসলীলা, খেল গোপাল, তাবাল চোংলি ও ক্যানোই নৃত্য বিশেষভাবে পরিচিত। বিহু নৃত্য অসমের নববর্ষ বা বোহাগ বিহুর প্রধান আকর্ষণ, যেখানে তরুণ-তরুণীরা মুগা সিল্কের পোশাকে ঢোল ও পেঁপার সুরে নাচেন।
প্রশ্ন: বোহাগ বিহু বছরে কোন সময়ে পালিত হয় এবং এর তাৎপর্য কী?উত্তর: বোহাগ বিহু এপ্রিল মাসে পালিত হয় এবং এটি অসমীয়া নববর্ষ ও নতুন কৃষি মরসুম শুরুর প্রতীক।
নোটস:
- বিহু নৃত্যে ব্যবহৃত ‘পেঁপা’ বাদ্যযন্ত্রটি মহিষের শিং দিয়ে তৈরি।
- অসমে বিহু তিন প্রকার — রঙালি (বোহাগ), কাতি ও মাঘ বিহু।
৮. পাঞ্জাব
পাঞ্জাবের নৃত্যে লিঙ্গভিত্তিক স্পষ্ট বিভাজন লক্ষণীয়। মহিলাদের ‘গিদ্ধা’ নৃত্যে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে হাততালি ও বোলির মাধ্যমে জীবনের সুখ-দুঃখ প্রকাশ পায়। পুরুষদের ‘ভাংরা’ নৃত্য বৈশাখী বা ফসল কাটার উৎসবে ঢোলের তালে পরিবেশিত হয়।
প্রশ্ন: ভাংরা নৃত্যের উৎপত্তি কোন ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত?
উত্তর: ভাংরা নৃত্যের উৎপত্তি গমের ফসল কাটার মরসুমের সঙ্গে যুক্ত, যা বৈশাখী উৎসবের সময় পালিত হয়।
নোটস:
- ভাংরা এখন বিশ্বজুড়ে ফিউশন সঙ্গীত ও নাচের সঙ্গে মিশে জনপ্রিয় হয়েছে।
- গিদ্ধা নৃত্যে গাওয়া লোকছড়াকে ‘বোলি’ বলা হয়।
৯. অন্ধ্রপ্রদেশ
অন্ধ্রপ্রদেশের ঘণ্টা মারদালা, থাপেত্তা গুন্নু ও বিধি নাটকর্ম উল্লেখযোগ্য লোকনৃত্য। ঘণ্টা মারদালায় নর্তকরা শরীরে বড় ঘণ্টা বেঁধে ঢোলের ছন্দে তাল মিলিয়ে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
প্রশ্ন: বিধি নাটকর্ম কী ধরনের পরিবেশনা?
উত্তর: বিধি নাটকর্ম একটি নৃত্য-নাট্য রীতি, যেখানে পৌরাণিক ও সামাজিক কাহিনি গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
নোটস:
- থাপেত্তা গুন্নু নৃত্যে ছোট ঢাক (তাপেত্তা) ব্যবহার করা হয়।
- এই নৃত্যগুলি সাধারণত মন্দির উৎসব বা গ্রাম্য মেলায় পরিবেশিত হয়।
১০. ছত্তিশগড়
ছত্তিশগড়ের ‘পানথি’ ও ‘রাউত নাচা’ নৃত্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। পানথি নৃত্য সৎনামী সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক গুরু ঘাসীদাসের নামকীর্তনের সঙ্গে যুক্ত। রাউত নাচা হলো যাদব বা রাউত সম্প্রদায়ের লাঠি নৃত্য, যা দীপাবলিতে শ্রীকৃষ্ণের লীলা স্মরণ করে পরিবেশিত হয়।
প্রশ্ন: পানথি নৃত্যের গতি পরিবেশনার সময় কীভাবে পরিবর্তিত হয়?
উত্তর: পানথি নৃত্য ধীর গতিতে শুরু হয়ে ক্রমশ দ্রুততর হয়, এবং শেষে নর্তকরা জটিল শারীরিক কসরত প্রদর্শন করেন।
নোটস:
- ঘাসীদাস ছিলেন সৎনামী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি সমতার বার্তা প্রচার করেছিলেন।
- রাউত নাচায় নর্তকরা লাঠি ও ঢাল ব্যবহার করেন।
১১. হিমাচল প্রদেশ
হিমাচল প্রদেশের ডাংলি, জাদ্দা, ঝোরা, ঝালি, মাহাসু ও কিন্নরী নটী নৃত্য উল্লেখযোগ্য। ‘নটী’ হিমাচলের সবচেয়ে জনপ্রিয় নৃত্য, যেখানে উৎসবের দিনে মানুষ বড় বৃত্ত তৈরি করে হাত ধরে ধীর গতিতে দীর্ঘক্ষণ নাচেন।
প্রশ্ন: নটী নৃত্য কোন কোন উৎসবে বিশেষভাবে পরিবেশিত হয়?
উত্তর: নটী নৃত্য কুল্লু দশেরা এবং শিমলার গ্রীষ্মকালীন উৎসবের মতো বড় সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে পরিবেশিত হয়।
নোটস:
- নটী নৃত্য গিনেস বুকে ‘বৃহত্তম লোকনৃত্য পরিবেশনা’র রেকর্ড গড়েছে।
- কিন্নর জেলার নটীকে ‘কিন্নরী নটী’ বলা হয়, যা এই নৃত্যের একটি আঞ্চলিক রূপ।
১২. বিহার
বিহারের কাঠপুতলি, ছৌ, কর্মা, যাত্রা, যাতা যতীন, জাদুর, বাখো, ঝিঝিয়া ও নাটনা উল্লেখযোগ্য লোকনৃত্য। যাতা যতীন উত্তর বিহারের মিথিলা অঞ্চলের গ্রামীণ নারীদের পরিবেশিত নৃত্য-নাট্য, যা বিবাহিত দম্পতির মধুর কলহ ও প্রেম নিয়ে গড়ে ওঠে। ঝিঝিয়া নৃত্য খরার সময়ে বৃষ্টির দেবতার আরাধনায় পরিবেশিত হয়।
প্রশ্ন: কর্মা নৃত্য কোন উপলক্ষে পরিবেশিত হয়?
উত্তর: কর্মা নৃত্য সাধারণত ফসল ভালো হওয়ার আশায় এবং কর্মা দেবতার আরাধনার উদ্দেশ্যে গ্রামীণ সম্প্রদায় দ্বারা পরিবেশিত হয়।
নোটস:
- ঝিঝিয়া নৃত্যে মহিলারা মাথায় ছিদ্রযুক্ত মাটির পাত্রে জ্বলন্ত প্রদীপ রেখে নাচেন।
- বিহারের কাঠপুতলি নাচ পুতুলনাচের সঙ্গে সংমিশ্রিত একটি বিশেষ পরিবেশনা।
১৩. উত্তরপ্রদেশ
উত্তরপ্রদেশের নউটংকি, থোরা, রাসলীলা, কাজরী ও চাপ্পেলি জনপ্রিয় লোকনৃত্য। রাসলীলা ব্রজ অঞ্চলে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি নিয়ে ভক্তিভরে পরিবেশিত হয়। নউটংকি হলো গ্রামীণ যাত্রাপালার শ্রেষ্ঠ রূপ।
প্রশ্ন: কাজরী নৃত্য-গান কোন ঋতুর সঙ্গে যুক্ত?
উত্তর: কাজরী মূলত বর্ষা ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গান-নৃত্য রীতি, যা সাওন মাসে মহিলারা দল বেঁধে পরিবেশন করেন।
নোটস:
- নউটংকি নৃত্য-নাট্যে সাধারণত ঐতিহাসিক ও রোমান্টিক কাহিনি তুলে ধরা হয়।
- মথুরা-বৃন্দাবন অঞ্চল রাসলীলার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
১৪. গোয়া
গোয়ার তারাঙ্গামেল, কুনবি, কোলি, জাগর, দেখনি ও র্যানমেল নৃত্য উল্লেখযোগ্য। কোলি নৃত্য গোয়ার মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা, যেখানে সমুদ্রের ঢেউ ও মাছ ধরার শৈলী নাচের মুদ্রায় ফুটে ওঠে।
প্রশ্ন: জাগর নৃত্য কী উদ্দেশ্যে পরিবেশিত হয়?
উত্তর: জাগর একটি রাত্রিকালীন আচার-অনুষ্ঠানভিত্তিক নৃত্য-নাট্য, যা স্থানীয় দেবতাদের জাগিয়ে তোলার এবং আশীর্বাদ প্রার্থনার উদ্দেশ্যে পরিবেশিত হয়।
নোটস:
- কুনবি নৃত্য গোয়ার আদি বাসিন্দা কুনবি সম্প্রদায়ের কৃষিভিত্তিক নৃত্য।
- গোয়ার নৃত্যে পর্তুগিজ সংস্কৃতির প্রভাবও লক্ষণীয়, বিশেষত দেখনি ধারায়।
১৫. গুজরাট
গুজরাটের গারবা ও ডান্ডিয়া রাস বিশ্বজোড়া পরিচিত, পাশাপাশি পাধার, রাস ও টিপ্পনি নৃত্যও প্রচলিত। গারবা নবরাত্রির সময় দেবী দুর্গার আরাধনায় গর্বদীপ ঘিরে বৃত্তাকারে পরিবেশিত হয়, আর ডান্ডিয়ায় রঙিন লাঠি নিয়ে নারী-পুরুষ উভয়েই অংশ নেন।
প্রশ্ন: টিপ্পনি নৃত্য সাধারণত কারা পরিবেশন করেন?
উত্তর: টিপ্পনি নৃত্য মূলত সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের শ্রমজীবী মহিলারা মেঝে পাকা করার কাজের সময় ছন্দোবদ্ধভাবে পরিবেশন করেন।
নোটস:
- গারবা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘গর্ভদীপ’ থেকে, যার অর্থ মাটির প্রদীপ।
- ডান্ডিয়া রাস কৃষ্ণ ও গোপীদের রাসলীলার স্মারক হিসেবে পরিবেশিত হয়।
১৬. হরিয়ানা
হরিয়ানার ঝুমর, ধামাল, লুর, গামা, খোরিয়া, গাপোর, ফ্যাগ ও ঘুমর নৃত্য উল্লেখযোগ্য। ঝুমর নৃত্য বিবাহিত মহিলাদের দ্বারা বিশেষ অলঙ্কার ও পোশাকে পরিবেশিত হয়, আর ফ্যাগ নৃত্য হোলি উৎসবের আনন্দ উদযাপনের অংশ।
প্রশ্ন: হরিয়ানার ঝুমর নৃত্যের সঙ্গে রাজস্থানের কোন নৃত্যের মিল রয়েছে?
উত্তর: হরিয়ানার ঝুমর নৃত্যের সঙ্গে রাজস্থানের ঘুমর নৃত্যের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে, উভয়ই মহিলাদের ঘূর্ণায়মান পোশাক-নির্ভর পরিবেশনা।
নোটস:
- ধামাল নৃত্য সাধারণত বিবাহ অনুষ্ঠানে পুরুষদের দ্বারা পরিবেশিত হয়।
- গাপোর নৃত্য দেবী গুগ্গার আরাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
১৭. রাজস্থান
রাজস্থানের ইউনেস্কো স্বীকৃত কালবেলিয়া ছাড়াও চাকরি, গিনাদ, গ্যাঙ্গোর, তেরহাতাল, ঝুমা, ঝুলন লীলা ও তেরা তলি নৃত্য সুপরিচিত। তেরা তলিতে মহিলারা শরীরের ১৩টি স্থানে করতাল বেঁধে বসে থেকেই জটিল ভঙ্গিমায় বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নাচ প্রদর্শন করেন।
প্রশ্ন: কালবেলিয়া নৃত্য কোন সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত এবং এটি কী নিয়ে পরিবেশিত হয়?
উত্তর: কালবেলিয়া নৃত্য সাপুড়ে বা কালবেলিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে নর্তকীরা সাপের চলাফেরার ভঙ্গিমা অনুকরণ করে দ্রুত ঘূর্ণায়মান মুদ্রায় নাচেন।
নোটস:
- কালবেলিয়া নৃত্য ২০১০ সালে ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ তালিকাভুক্ত হয়।
- গ্যাঙ্গোর নৃত্য দেবী পার্বতীর আরাধনায় পরিবেশিত হয়।
১৮. মণিপুর
মণিপুরের থাং তা ও দোল চোলাম নৃত্য ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। থাং তা একটি মার্শাল আর্ট ভিত্তিক নৃত্য, যেখানে তরবারি ও ঢাল নিয়ে যুদ্ধকৌশল ও বীরত্ব প্রদর্শিত হয়।
প্রশ্ন: দোল চোলাম নৃত্য কোন উৎসবের সঙ্গে যুক্ত?
উত্তর: দোল চোলাম মূলত হোলি বা দোলযাত্রা উৎসবের সময় পরিবেশিত হয়, যেখানে নর্তকরা ঢোল বাজিয়ে অত্যন্ত ছন্দোময় শারীরিক কসরত প্রদর্শন করেন।
নোটস:
- থাং তা মণিপুরি ধ্রুপদী রাসলীলার পাশাপাশি রাজ্যের সামরিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।
- মণিপুরের ধ্রুপদী রাসলীলা ভারতের আটটি স্বীকৃত ধ্রুপদী নৃত্যধারার একটি।
১৯. জম্মু ও কাশ্মীর
জম্মু ও কাশ্মীরের দুমহল, রাউফ ও হিকাত নৃত্য উপত্যকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাউফ নৃত্য বসন্তকালে ও ইদের সময়ে মুসলিম রমণীরা দুটি সারিতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে লোকগীতির সুরে পরিবেশন করেন।
প্রশ্ন: দুমহল নৃত্য কাশ্মীরের কোন সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত?
উত্তর: দুমহল নৃত্য কাশ্মীরের ওয়াটাল সম্প্রদায়ের পুরুষদের দ্বারা পরিবেশিত হয়, যা সাধারণত বিশেষ উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়।
নোটস:
- রাউফ নৃত্যে কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কেবল ছন্দোবদ্ধ পদচারণায় নাচ পরিবেশিত হয়।
- হিকাত নৃত্য সাধারণত বিবাহ অনুষ্ঠানে মহিলাদের দ্বারা পরিবেশিত হয়।
২০. মধ্যপ্রদেশ
মধ্যপ্রদেশের তেরতালি, চারকুলা ও জাওয়ারা নৃত্য উল্লেখযোগ্য। জাওয়ারা নৃত্য বুন্দেলখন্ড অঞ্চলের শস্য কাটার উৎসবকেন্দ্রিক, যেখানে গ্রামীণ মহিলারা মাথায় শস্যপূর্ণ পাত্র ব্যালেন্স করে দক্ষতার সঙ্গে নাচেন।
প্রশ্ন: চারকুলা নৃত্যের বিশেষত্ব কী?
উত্তর: চারকুলা নৃত্যে নর্তকীরা মাথায় প্রদীপ-সজ্জিত বৃত্তাকার কাঠামো (চারকুলা) নিয়ে ব্রজ অঞ্চলে রাধাষ্টমীর সময় নাচ পরিবেশন করেন।
নোটস:
- তেরতালি নৃত্য রাজস্থান-সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কামর সম্প্রদায়ের দ্বারাও পরিবেশিত হয়।
- জাওয়ারা নৃত্য মূলত নবরাত্রির সময় জাওয়ারা (অঙ্কুরিত গম) বপনের উৎসবের সঙ্গে যুক্ত।
সংক্ষিপ্ত পুনরালোচনা সারণি (Quick Revision Table)
| রাজ্য | প্রধান লোকনৃত্য |
|---|---|
| পশ্চিমবঙ্গ | ছৌ, বাউল, কীর্তন |
| মহারাষ্ট্র | লাবণী, তামাশা, দশাবতার |
| কর্ণাটক | যক্ষগণ, ডোলু কুনিথা |
| কেরালা | কালিয়াট্টাম, কাইকোট্টিকালি |
| তামিলনাড়ু | কোলাটম, কাভাডি, কারাগাম |
| ওড়িশা | গোটি পুয়া, ছৌ (ময়ূরভঞ্জ) |
| অসম | বিহু |
| পাঞ্জাব | গিদ্ধা (মহিলা), ভাংরা (পুরুষ) |
| অন্ধ্রপ্রদেশ | ঘণ্টা মারদালা, বিধি নাটকর্ম |
| ছত্তিশগড় | পানথি, রাউত নাচা |
| হিমাচল প্রদেশ | নটী |
| বিহার | যাতা যতীন, ঝিঝিয়া |
| উত্তরপ্রদেশ | নউটংকি, রাসলীলা |
| গোয়া | কোলি, জাগর |
| গুজরাট | গারবা, ডান্ডিয়া রাস |
| হরিয়ানা | ঝুমর, ফ্যাগ |
| রাজস্থান | কালবেলিয়া, তেরা তলি |
| মণিপুর | থাং তা, দোল চোলাম |
| জম্মু ও কাশ্মীর | রাউফ, দুমহল |
| মধ্যপ্রদেশ | জাওয়ারা, চারকুলা |
পরীক্ষার জন্য মনে রাখার কৌশল: যে নৃত্যগুলি একাধিক রাজ্যে দেখা যায় (যেমন ছৌ — পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা) সেগুলির আঞ্চলিক ভিন্নতা আলাদাভাবে মনে রাখা জরুরি, কারণ পরীক্ষায় প্রায়ই এই ধরনের প্রশ্ন আসে।

