বিংশ শতাব্দীর ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বাম আন্দোলন: বৈশিষ্ট্য ও পর্যবেক্ষণ( PART- 1)

Download Notes Pdf – Click Here

বিংশ শতকের কৃষক আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস ও বামপন্থী রাজনীতি

জাতীয় কংগ্রেসের ভূমিকা

• বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন (১৯০৫):
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে কংগ্রেস আন্দোলন সংগঠিত করলেও কৃষকদের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। আন্দোলনটি মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।

• চম্পারণ সত্যাগ্রহ (১৯১৭):
বিহারের চম্পারণে নীলচাষিদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে ওঠে। কংগ্রেস কৃষকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

• খেদা সত্যাগ্রহ (১৯১৮):
গুজরাটের খেদা জেলার কৃষকরা খাজনা বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করলে গান্ধীজি ও কংগ্রেস তাদের সমর্থন করে।

• অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০):
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক কৃষক অংশগ্রহণ করেন।

• আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০):
লবণ সত্যাগ্রহ ও অন্যান্য কর্মসূচিতে কৃষকদের অংশগ্রহণ জাতীয় আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।

• ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২):
কংগ্রেসের আহ্বানে কৃষকরা ব্যাপকভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামকে গণআন্দোলনের রূপ দেয়।

• কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল (CSP), ১৯৩৪:
কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী একটি গোষ্ঠী গঠিত হয়, যারা কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়।

বামপন্থী রাজনীতির ভূমিকা

• অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভা (১৯৩৬):
স্বামী সহজানন্দ সরস্বতীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতের বৃহত্তম কৃষক সংগঠন হিসেবে পরিচিত।

• জমিদারি প্রথার বিরোধিতা:
বামপন্থীরা জমিদারি প্রথা বিলোপ এবং “লাঙল যার জমি তার” নীতির সমর্থন করে।

• কৃষকদের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা:
খাজনা হ্রাস, ঋণের বোঝা কমানো এবং কৃষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন পরিচালনা করে।

• তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬):
বাংলার ভাগচাষিদের ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ পাওয়ার দাবিতে কমিউনিস্ট নেতৃত্বে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়।

• তেলেঙ্গানা আন্দোলন:
জমিদারি শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের সশস্ত্র সংগ্রামে বামপন্থীরা নেতৃত্ব দেয়।

• গণআন্দোলন ও সংগঠন গঠন:
বামপন্থীরা কৃষকদের সংগঠিত করে স্বাধীনতা সংগ্রামকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত করতে সাহায্য করে।

উপসংহার

জাতীয় কংগ্রেস কৃষকদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল, আর বামপন্থী রাজনীতি কৃষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে এনেছিল। উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিংশ শতকের কৃষক আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বদেশী আন্দোলন-পর্বে কৃষক আন্দোলন

কৃষকদের দূরত্ব ও সীমিত অংশগ্রহণ

• নেতৃত্বের অভাব:
স্বদেশী আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রধানত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত (ভদ্রলোক) শ্রেণির হাতে ছিল। ফলে কৃষকদের বাস্তব সমস্যা ও দাবি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

• জমিদারদের প্রভাব:
আন্দোলনের অনেক নেতা ছিলেন জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি। শোষিত কৃষকদের একটি বড় অংশ, বিশেষত মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা, আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি।

• অর্থনৈতিক চাপ:
বিলাতি পণ্য বর্জনের ফলে দেশীয় পণ্য ব্যবহার করতে বলা হলেও দেশীয় কাপড়ের দাম বেশি হওয়ায় দরিদ্র কৃষকদের জন্য তা গ্রহণ করা কঠিন ছিল।

আন্দোলনের ইতিবাচক দিক ও ব্যতিক্রমী ঘটনা

• কৃষক সমাবেশ:
ময়মনসিংহ, বরিশাল ও রংপুর অঞ্চলে অশ্বিনীকুমার দত্তের নেতৃত্বে বহু কৃষক স্বদেশী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।

• বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা:
কৃষকদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর হস্তশিল্প ও কুটির শিল্পের প্রসার ঘটানো হয়।

• স্বদেশী প্রচার:
চারণকবি মুকুন্দ দাস ও অন্যান্য লোকশিল্পীরা গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে স্বদেশী ভাবধারা ছড়িয়ে দেন।

সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও ব্যর্থতা

• বিভাজন নীতি:
ব্রিটিশ সরকারের “ভাগ করো ও শাসন করো” নীতির ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকদের একটি বড় অংশ স্বদেশী আন্দোলনকে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আন্দোলন বলে মনে করতে শুরু করে।

• সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা:
১৯০৬-০৭ সালে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যা কৃষক ও জমিদারদের মধ্যে বিভেদ আরও বৃদ্ধি করে।

মূল্যায়ন

• ড. বিপান চন্দ্রের মতে:
স্বদেশী আন্দোলন আশানুরূপভাবে বাংলার কৃষক সমাজকে স্পর্শ করতে পারেনি।

• ড. সুমিত সরকারের মতে:
কৃষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাব থাকায় তারা আন্দোলন থেকে দূরে ছিল।

• উপসংহার:
স্বদেশী আন্দোলন জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটালেও কৃষকদের বৃহত্তর অংশকে সম্পূর্ণভাবে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়নি। তবে এটি পরবর্তী কৃষক আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করেছিল।

MCQ:-

বঙ্গভঙ্গের পর গঠিত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের রাজধানী কোথায় ছিল?
A) ঢাকা
B) চট্টগ্রাম
✅ C) কলকাতা
D) ময়মনসিংহ

Answer: C) কলকাতা

Question 2
‘বয়কট’ বলতে স্বদেশী আন্দোলনের সময় কী বোঝানো হয়েছিল?
A) শুধু বিদেশি কাপড় বর্জন
B) বিদেশি শাসকদের বর্জন
✅ C) বিলিতি পণ্য ও চিন্তাধারা উভয়ের বর্জন
D) দেশীয় দ্রব্যের ব্যবহার

Answer: C) বিলিতি পণ্য ও চিন্তাধারা উভয়ের বর্জন

Question 3
ডঃ বিপানচন্দ্রের মতে স্বদেশী আন্দোলনের কোন সীমাবদ্ধতা ছিল?
A) শ্রমিকদের অংশগ্রহণ কম ছিল
B) মুসলিম নেতৃত্বের অভাব ছিল
✅ C) বাংলার কৃষকসমাজকে আন্দোলন স্পর্শ করতে পারেনি
D) কংগ্রেসের সমর্থন ছিল না

Answer: C) বাংলার কৃষকসমাজকে আন্দোলন স্পর্শ করতে পারেনি

Question 4
‘তিনকাঠিয়া প্রথা’ বলতে বোঝায়—
A) জমির তিন ভাগের এক ভাগে নীলচাষ
✅ B) প্রতি বিঘায় ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতামূলক নীলচাষ
C) তিন বছর অন্তর নীলচাষ
D) তিন ধরনের কর প্রদান

Answer: B) প্রতি বিঘায় ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতামূলক নীলচাষ

Question 5
নিচের কোন আন্দোলনটি গান্ধীজির প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন ছিল?
A) খেদা আন্দোলন
B) অসহযোগ আন্দোলন
✅ C) চম্পারণ সত্যাগ্রহ
D) ভারত ছাড়ো আন্দোলন

Answer: C) চম্পারণ সত্যাগ্রহ

Question 6
‘লাঙল যার, জমি তার’ নীতিতে কারা বিশ্বাসী ছিল?
A) কংগ্রেসের নরমপন্থীরা
B) ব্রিটিশ সরকার
✅ C) বামপন্থীরা
D) মুসলিম লীগ

Answer: C) বামপন্থীরা

Question 7
অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভা গঠিত হয়—
A) ১৯৩৪ সালে
✅ B) ১৯৩৬ সালে
C) ১৯৪২ সালে
D) ১৯১৭ সালে

Answer: B) ১৯৩৬ সালে

Question 8
স্বদেশী আন্দোলনের সময় কৃষকদের মধ্যে স্বদেশী ভাবধারা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন—
A) রাজেন্দ্র প্রসাদ
✅ B) মুকুন্দ দাস
C) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
D) জে. বি. কৃপালনী

Answer: B) মুকুন্দ দাস

Question 9
নিচের কোন জোড়াটি সঠিক নয়?
A) চম্পারণ — নীলচাষ
B) খেদা — খাজনা বৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলন
C) তেভাগা — বামপন্থী নেতৃত্ব
✅ D) বঙ্গভঙ্গ — গান্ধীজির নেতৃত্বে সংঘটিত

Answer: D) বঙ্গভঙ্গ — গান্ধীজির নেতৃত্বে সংঘটিত

Question 10
নিচের কোন নেতা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ‘গুরুতর জাতীয় বিপর্যয়’ মন্তব্য করেন?
A) বিপিনচন্দ্র পাল
B) লালা লাজপত রায়
✅ C) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
D) অরবিন্দ ঘোষ

Answer: C) সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

Question 11
খেরা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল—
A) বিহারে
B) পাঞ্জাবে
✅ C) গুজরাটে
D) বাংলায়

Answer: C) গুজরাটে

Question 12
নিচের কোনটি স্বদেশী আন্দোলনে কৃষকদের দূরে থাকার কারণ ছিল না?
A) নেতৃত্বের অভাব
B) জমিদারদের প্রভাব
✅ C) কৃষকদের অতিরিক্ত রাজনৈতিক সচেতনতা
D) দেশীয় দ্রব্যের উচ্চ মূল্য

Answer: C) কৃষকদের অতিরিক্ত রাজনৈতিক সচেতনতা

Question 13
চম্পারণ আন্দোলনে গান্ধীজিকে আমন্ত্রণ জানান—
A) সীতারাম দাস
✅ B) রাজকুমার শুক্ল
C) স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী
D) অর্জুন সিং

Answer: B) রাজকুমার শুক্ল

Question 14
নিচের কোন ঘটনাটি কৃষকদের মধ্যে নতুন চেতনা সৃষ্টি করেছিল?
A) বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন
B) আইন অমান্য আন্দোলন
✅ C) ভারত ছাড়ো আন্দোলন
D) খেদা সত্যাগ্রহ

Answer: C) ভারত ছাড়ো আন্দোলন

Question 15
অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভার প্রতিষ্ঠাতা নেতা ছিলেন—
A) এন. জি. রঙ্গা
✅ B) স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী
C) জওহরলাল নেহরু
D) বল্লভভাই প্যাটেল

Answer: B) স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী

Question 16
১৯০৭ সালে পাঞ্জাবে অতিরিক্ত জলকর বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—
A) গান্ধীজি ও নেহরু
✅ B) লালা লাজপত রায় ও অজিত সিং
C) বিপিনচন্দ্র পাল ও তিলক
D) সুভাষচন্দ্র বসু ও চিত্তরঞ্জন দাস

Answer: B) লালা লাজপত রায় ও অজিত সিং

Question 17
খাজনা বন্ধের আন্দোলন ১৯১৬ সালে মেওয়াড়ে কার নেতৃত্বে হয়েছিল?
A) রাজকুমার শুক্ল
✅ B) সীতারাম দাস
C) স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী
D) অরবিন্দ ঘোষ

Answer: B) সীতারাম দাস

Question 18
বামপন্থীদের নেতৃত্বে সংঘটিত বিখ্যাত কৃষক আন্দোলন ছিল—
A) চম্পারণ আন্দোলন
B) খেদা আন্দোলন
✅ C) তেভাগা আন্দোলন
D) অসহযোগ আন্দোলন

Answer: C) তেভাগা আন্দোলন

Question 19
স্বদেশী আন্দোলনের দুটি প্রধান ধারা ছিল—
A) অহিংসা ও সত্যাগ্রহ
✅ B) স্বদেশী ও বয়কট
C) খাজনা বন্ধ ও ধর্মঘট
D) অসহযোগ ও আইন অমান্য

Answer: B) স্বদেশী ও বয়কট

Question 20
বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়েছিল—
A) ১৯০৩ সালে
✅ B) ১৯০৫ সালে
C) ১৯০৭ সালে
D) ১৯১১ সালে

Answer: B) ১৯০৫ সালে ✅

Scroll to Top