ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত বিকল্প ধারণা (PART- 2)

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স (Pointwise)

১. পরিচয়

  • উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫) ছিলেন শিশুসাহিত্যিক, চিত্রকর, সংগীতজ্ঞ ও আধুনিক বাংলা মুদ্রণ শিল্পের পথিকৃৎ।
  • তিনি ময়মনসিংহ জেলার মসুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
  • প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন।

২. সাহিত্য ও পত্রিকা

  • ‘মুকুল’, ‘সাথী’, ‘সখা’, ‘বালক’ প্রভৃতি শিশু পত্রিকায় লিখতেন।
  • তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ছিল ‘ছেলেদের রামায়ণ’
  • শিশু সাহিত্যকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

৩. ইউ. এন. রায় অ্যান্ড সন্স প্রতিষ্ঠা

  • মুদ্রণের নিম্নমান নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে আধুনিক যন্ত্র আমদানি করেন।
  • ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে ‘ইউ. রে অ্যান্ড কোং’ প্রতিষ্ঠা করেন।
  • পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘ইউ. রে অ্যান্ড সন্স’ রাখা হয়।
  • কলকাতার ১০০ গড়পার রোডে ছাপাখানাটি স্থাপিত হয়।

৪. মুদ্রণ প্রযুক্তিতে অবদান

  • হাফটোন ব্লক প্রিন্টিং প্রযুক্তির উন্নয়ন করেন।
  • ছবি ছাপার নতুন ও উন্নত পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
  • ‘স্ক্রিন অ্যাডজাস্টমেন্ট ইন্ডিকেটর’ নামে যন্ত্র উদ্ভাবন করেন।
  • তাঁর প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ছাপাখানায় পরিণত হয়।

৫. সন্দেশ পত্রিকা

  • ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে রঙিন ছবি সম্বলিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন।
  • এটি এশিয়ার প্রথম রঙিন শিশু পত্রিকাগুলির মধ্যে অন্যতম।
  • পরে সম্পাদনার দায়িত্ব নেন সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় ও সন্দীপ রায়।

৬. উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা

  • সেকালের কথা
  • টুনটুনির বই
  • ছেলেদের মহাভারত
  • গুপি গাইন বাঘা বাইন

৭. গুরুত্ব

  • বাংলা মুদ্রণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন।
  • শিশু সাহিত্য, চিত্রাঙ্কন ও মুদ্রণ প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী অবদান রাখেন।
  • তাঁকে আধুনিক বাংলা মুদ্রণ শিল্পের অন্যতম জনক বলা হয়।

ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স (IACS) – Pointwise

১. প্রতিষ্ঠা

  • প্রতিষ্ঠাতা: ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার
  • প্রতিষ্ঠাকাল: ২৯ জুলাই, ১৮৭৬
  • স্থান: বউবাজার স্ট্রিট, কলকাতা
  • এটি ভারতের প্রথম এবং এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

২. প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য

  • বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা।
  • পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের জ্ঞান প্রচার।
  • বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রসার ঘটানো।
  • অন্ধবিশ্বাস দূর করে যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠা করা।

৩. প্রধান পৃষ্ঠপোষক

  • স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
  • রাজেন্দ্রলাল মিত্র
  • সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৪. গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

  • প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায় (প্রথম অধিকর্তা)
  • সত্যেন্দ্রনাথ বসু
  • জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ
  • নীলরতন সরকার

৫. গবেষণার ক্ষেত্র

  • পদার্থবিদ্যা
  • রসায়ন
  • আলোকবিজ্ঞান
  • চুম্বকত্ব
  • এক্স-রে গবেষণা
  • রমন ক্রিয়া

৬. বিখ্যাত বিজ্ঞানী

  • সি. ভি. রমন
  • মেঘনাদ সাহা
  • জগদীশচন্দ্র বসু
  • আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
  • কে. এন. কৃষ্ণান
  • সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর

৭. রমন এফেক্ট

  • ১৯২৮ সালে সি. ভি. রমন IACS-এ রমন এফেক্ট আবিষ্কার করেন।
  • এর জন্য ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

৮. নিজস্ব পত্রিকা

  • Indian Journal of Physics
  • এখানে দেশ-বিদেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকাশিত হতো।

৯. গুরুত্ব

  • বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে।
  • গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • পরবর্তীকালে বসু বিজ্ঞান মন্দির ও কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।
  • ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস (Pointwise)

  • ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলায় কারিগরি শিক্ষার জন্য কলকাতা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করে।
  • ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার ফলে স্বদেশী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।
  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যঙ্গ করে “গোলদিঘির গোলামখানা” বলা হতো।
  • প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রথম “জাতীয় শিক্ষা” শব্দটি ব্যবহার করেন।
  • ৮ নভেম্বর ১৯০৫ রংপুরে প্রথম জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ১৬ নভেম্বর ১৯০৫ পার্ক স্ট্রিটের সভায় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
  • ১১ মার্চ ১৯০৬ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ৯২ জন সদস্য নিয়ে প্রথম পরিষদ গঠিত হয়।
  • ১৫ আগস্ট ১৯০৬ “জাতীয় শিক্ষা পরিষদ” (National Council of Education) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদের প্রধান উদ্দেশ্য

  • দেশসেবার মনোভাব জাগ্রত করা।
  • নৈতিক শিক্ষা প্রদান।
  • বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার।
  • মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
  • জাতীয় আদর্শভিত্তিক সাহিত্য শিক্ষা প্রদান।

প্রধান পৃষ্ঠপোষক

  • হীরেন্দ্রনাথ দত্ত
  • ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
  • রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক
  • গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
  • অরবিন্দ ঘোষ

দান

  • সুবোধচন্দ্র মল্লিক — ১ লক্ষ টাকা
  • ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী — ৫ লক্ষ টাকা
  • সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী — ২.৫ লক্ষ টাকা

বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ

  • ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ।
  • এখানে বিনয়কুমার সরকার, ধর্মানন্দ কোশাম্বী, সখারাম গণেশ দেউসকর, রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ শিক্ষকতা করেন।

গুরুত্ব

  • বাংলায় স্বদেশী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
  • জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক শিক্ষার প্রসার ঘটে।
  • বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়।
  • পরবর্তীকালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (Pointwise)

  • ১৯০৬ সালে তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • উদ্দেশ্য ছিল কারিগরি শিক্ষা ও স্বনির্ভরতা অর্জন।
  • ১৯১০ সালে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ এর সঙ্গে যুক্ত হয়।
  • পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, রসায়ন প্রযুক্তি ও শিল্প প্রযুক্তি পড়ানো হতো।
  • ১৯২৪ সালে যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয়।
  • ১৯২৮ সালে এর নাম হয় College of Engineering and Technology (CET)।
  • ১৯৫৫ সালে এটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফলাফল

  • বাংলায় কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।
  • যুবসমাজ স্বনির্ভর হয়ে ওঠে।
  • নতুন কারিগরি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
  • দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বসুবিজ্ঞান মন্দির (Pointwise)

  • ৩০ নভেম্বর ১৯১৭ সালে আচার্য স্যার জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় বসুবিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute) প্রতিষ্ঠা করেন।
  • এটি এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং ভারতের প্রথম আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান
  • এটি একটি কেন্দ্রীয় স্বায়ত্তশাসিত (Autonomous) গবেষণা প্রতিষ্ঠান

প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য

  • ১৯১৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর জগদীশচন্দ্র বসু এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
  • মূল উদ্দেশ্য ছিল—
    • আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রসার।
    • বিশ্বমানের বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা।
    • ভারতীয় বিজ্ঞানীদের গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা।

অবস্থান

  • প্রধান ক্যাম্পাস: ৯৩/১ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, কলকাতা
  • অতিরিক্ত ক্যাম্পাস: কাঁকুড়গাছির আচার্য জে.সি. বসু শতবার্ষিকী ক্যাম্পাস

স্থাপত্য ও প্রতীক

  • ভবনটি চুঁচুড়ার লাল পাথর দিয়ে নির্মিত।
  • প্রতিষ্ঠানের প্রতীক হলো ‘বজ্রচিহ্ন’
  • এই প্রতীকটি ভগিনী নিবেদিতা কল্পনা করেছিলেন।
  • বজ্রচিহ্ন শক্তি, জ্ঞান ও অগ্রগতির প্রতীক।

গবেষণার ক্ষেত্র

  • প্রথমদিকে উদ্ভিদ-শরীরতত্ত্ব (Plant Physiology) নিয়ে গবেষণা করা হতো।
  • বর্তমানে গবেষণা হয়—
    • পদার্থবিদ্যা (Physics)
    • বায়োফিজিক্স (Biophysics)
    • রসায়ন (Chemistry)
    • মাইক্রোবায়োলজি (Microbiology)
    • মলিকিউলার বায়োলজি (Molecular Biology)
    • পরিবেশ বিজ্ঞান (Environmental Science)

জগদীশচন্দ্র বসু মিউজিয়াম

  • এখানে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংরক্ষিত আছে।
  • তাঁর জীবনের বিভিন্ন স্মারক ও গবেষণাসামগ্রীও প্রদর্শিত হয়।

গুরুত্ব

  • ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
  • বিজ্ঞান গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
  • বহু বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
  • আজও এটি আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর বৈজ্ঞানিক আদর্শ ও গবেষণার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজ্ঞান চর্চা (Calcutta University)

প্রেক্ষাপট ও স্বশাসন

  • প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার সময় জগদীশচন্দ্র বসুপ্রফুল্লচন্দ্র রায় ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হতেন।
  • এই হস্তক্ষেপ তাঁদের গবেষণার কাজে বাধা সৃষ্টি করত।
  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বশাসিত (Autonomous) প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সেখানে গবেষণার স্বাধীন পরিবেশ গড়ে ওঠে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষার সূচনা হয়।
  • ফলে এটি স্বাধীন বৈজ্ঞানিক গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অবদান

  • স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ১৯০৬ সাল থেকে প্রায় ১০ বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।
  • তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
  • গণিত গবেষণার প্রসারের জন্য তিনি Calcutta Mathematical Society প্রতিষ্ঠা করেন।
  • Indian Science Congress গঠনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠা

  • ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিজ্ঞান কলেজ (Science College) প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • রসায়ন বিভাগের পালিত অধ্যাপক ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়
  • পদার্থবিদ্যা বিভাগের পালিত অধ্যাপক ছিলেন সি. ভি. রমন
  • গণিত বিভাগে গণেশ প্রসাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের অবদান

  • মেঘনাদ সাহা
  • জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ
  • জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখার্জী
  • সত্যেন্দ্রনাথ বসু

উপরোক্ত বিজ্ঞানীরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও বিজ্ঞানচর্চাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হতো।
  • সি. ভি. রমন তাঁর গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
  • সত্যেন্দ্রনাথ বসু-র গবেষণা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর কাজের উচ্চ প্রশংসা করেন।
  • বসু-আইনস্টাইনের যৌথ তত্ত্ব পরবর্তীকালে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।

গুরুত্ব

  • বাংলায় আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • এটি ভারতের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়।
  • বহু বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর কর্মক্ষেত্র ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।

ঔপনিবেশিক শিক্ষার ধারণা

প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য

  • ঔপনিবেশিক শিক্ষা ছিল ব্রিটিশ শাসকদের প্রবর্তিত পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা।
  • এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করা।
  • প্রশাসনিক কাজের জন্য ইংরেজি জানা কেরানি ও কর্মচারী গড়ে তোলাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
  • এই শিক্ষাব্যবস্থা ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কহীন ছিল।
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই শিক্ষাব্যবস্থাকে “প্রেমিকের প্রীতি নয়, কৃপণের আসক্তি” বলে অভিহিত করেন।

ঔপনিবেশিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্য

  • শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষা প্রাধান্য পায়।
  • পাশ্চাত্য জ্ঞান ও মূল্যবোধ প্রচার করা হয়।
  • ভারতীয় ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা হয়।
  • শিক্ষা মূলত উচ্চবিত্ত ও শহুরে শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
  • সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত।

ডাউনওয়ার্ড ফিল্টারেশন তত্ত্ব

  • ব্রিটিশরা Downward Filtration Theory অনুসরণ করত।
  • প্রথমে উচ্চবিত্তদের শিক্ষা দেওয়া হবে।
  • পরে তাদের মাধ্যমে শিক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে—এমন ধারণা প্রচলিত ছিল।

ঔপনিবেশিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা

  • দেশীয় ভাষার গুরুত্ব কমে যায়।
  • প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
  • ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত ছিল।
  • বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার যথাযথ বিকাশ ঘটেনি।
  • শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
  • শিক্ষা সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছাতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনোভাব

  • রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করেন।
  • তিনি এটিকে যান্ত্রিক ও প্রাণহীন শিক্ষা বলে মনে করতেন।
  • তাঁর মতে এই শিক্ষা মুখস্থবিদ্যার উপর নির্ভরশীল ছিল।
  • এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও হীনমন্যতা সৃষ্টি করত।
  • শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করত।
  • প্রকৃতির সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক নষ্ট করত।

বিকল্প শিক্ষার ধারণা

  • রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
  • তিনি প্রকৃতি-ভিত্তিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা (Experiential Learning)-এর উপর গুরুত্ব দেন।
  • শিক্ষার মাধ্যমে সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশের কথা বলেন।

ফলাফল

  • ঔপনিবেশিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে শিক্ষাবিদরা জাতীয় শিক্ষার আন্দোলন শুরু করেন।
  • জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (১৯০৬) প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • পরবর্তীকালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশীয় শিক্ষার বিকল্প পথ গড়ে ওঠে।
  • জাতীয়তাবাদী ও স্বদেশী শিক্ষাচিন্তার বিকাশ ঘটে।

বিশ্বভারতীর বিভিন্ন পরিকল্পনা

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, শিক্ষার লক্ষ্য হলো মানুষের অন্তর্নিহিত মানুষটিকে খাঁটি মানুষে রূপান্তরিত করা।
  • তিনি মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেন।
  • তাঁর শিক্ষাচিন্তা তৎকালীন ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থার তুলনায় অধিক উদার ও বিশ্বজনীন ছিল।
  • তিনি মহীশূর (১৯১৬), বারাণসী (১৯১৬), পাটনা (১৯১৭) এবং ওসমানিয়া (১৯১৮) বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষাধারার প্রচারের চেষ্টা করেন।

বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা

  • ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
  • তিনি এর নাম দেন ‘বিশ্বভারতী’
  • তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হলো—
    • সত্যানুসন্ধান
    • মুক্তচিন্তার বিকাশ
    • রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
    • বিশ্বমানবতার চেতনা গড়ে তোলা

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

  • ১৯২১ সালে বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • এখানে কলাবিদ্যার পাশাপাশি নিম্নলিখিত বিষয় পড়ানো হতো—
    • অর্থশাস্ত্র
    • স্বাস্থ্যবিদ্যা
    • কৃষিবিজ্ঞান
    • পল্লীউন্নয়ন
    • বিজ্ঞান শিক্ষা
  • দেশ-বিদেশের বহু ছাত্র ও পণ্ডিত এখানে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য আসতেন।

গ্রন্থাগার ও শিক্ষা কার্যক্রম

  • বিশ্বভারতীর গ্রন্থাগার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র।
  • এখানে মূল্যবান গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকার বিশাল সংগ্রহ ছিল।
  • গবেষণা, সাহিত্য, কৃষি-অর্থনীতি এবং পল্লীশিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।

বিশ্বভারতীর দুটি প্রধান কেন্দ্র

  • শান্তিনিকেতন (বীরভূম)
  • শ্রীনিকেতন

শ্রীনিকেতনের উদ্দেশ্য

  • গ্রামীণ উন্নয়ন
  • কৃষি শিক্ষা
  • কারিগরি শিক্ষা
  • কুটির শিল্পের প্রসার
  • গ্রামীণ সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন

কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা

  • ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিদর্শকের অনুমোদনক্রমে নিযুক্ত হতেন।

উল্লেখযোগ্য ছাত্রছাত্রী

  • ইন্দিরা গান্ধী
  • সত্যজিৎ রায়
  • অমর্ত্য সেন
  • মহাশ্বেতা দেবী
  • সুচিত্রা মিত্র

গুরুত্ব

  • বিশ্বভারতী ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প শিক্ষামডেল হিসেবে গড়ে ওঠে।
  • এটি ভারতীয় সংস্কৃতি ও বিশ্বসংস্কৃতির মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত।
  • শিক্ষা, গবেষণা, কৃষি ও পল্লীউন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বভারতী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

mcq:-

Question 1

বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন—
A) জগদীশ চন্দ্র বসু ✅
B) সত্যেন্দ্রনাথ বসু
C) চন্দ্রমুখী বসু
D) আনন্দমোহন বসু

Question 2

ইউ এন রায় অ্যান্ড সন্স ভূমিকা নিয়েছিল—
A) বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে
B) বাংলার চিকিৎসা বিদ্যার প্রসারে
C) বাংলা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে
D) বাংলার মুদ্রণশিল্পের প্রসারে ✅

Question 3

ভারতে হাফটোন প্রিন্টিং পদ্ধতি প্রবর্তন করেন—
A) উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ✅
B) সুকুমার রায়
C) পঞ্চানন কর্মকার
D) চার্লস উইলকিনস

Question 4

বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন—
A) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
B) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ✅
C) স্বামী বিবেকানন্দ
D) দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Question 5

বাংলা ভাষার প্রথম ছাপা বই হল—
A) বর্ণপরিচয়
B) এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ ✅
C) মঙ্গল সমাচার
D) অন্নদামঙ্গল

Question 6

ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (IACS)-এর সঙ্গে যুক্ত যে বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন—
A) জগদীশ চন্দ্র বসু
B) সি. ভি. রমন ✅
C) প্রফুল্লচন্দ্র রায়
D) সত্যেন্দ্রনাথ বসু

Question 7

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়—
A) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে
B) ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ✅
C) ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে
D) ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে

Question 8

‘বর্ণপরিচয়’ প্রকাশিত হয়েছিল—
A) ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে
B) ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে
C) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ✅
D) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে

Question 9

বাংলা ভাষার প্রথম বই ছাপা হয়—
A) ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে
B) ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ✅
C) ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে
D) ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে

Question 10

বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন—
A) অরবিন্দ ঘোষ
B) সতীশচন্দ্র বসু
C) যোগেশচন্দ্র ঘোষ
D) প্রমথনাথ বসু ✅

Scroll to Top