
ভাষা ও উপভাষা কী?
ভাষা: ভাষা হল মানুষের ভাব প্রকাশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য মাধ্যম। ভাব প্রকাশের অভিপ্রায়ে ভাষার জন্ম। তবে মনে রাখতে হবে যে, এই ভাষার মাধ্যমে কেবলমাত্র মানুষই ভাব প্রকাশ করে। তাই ভাষা হল-মানুষের বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত কতগুলি অর্থবহ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির মাধ্যমে একটি বৃহৎ সমাজের জনগোষ্ঠী যখন নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে।
উপভাষা: উপভাষা হল ভাষার ব্যাবহারিকরূপ। কোনো ভাষা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছোটো ছোটো দলে বা অঞ্চলে প্রচলিত ভাষাছাঁদ হল উপভাষা। অর্থাৎ উপভাষা হল ভাষার অন্তর্গত বিশেষ বিশেষ রূপ, যা একটি বিশেষ অঞ্চলে প্রচলিত, যার সঙ্গে মূল ভাষার ধ্বনিগত, রূপগত এবং বাক্তারাগত বেশ কিছু পার্থক্য থাকে। তবে সেই পার্থক্যটি খুব বেশি হয় না।
ভাষা থেকে উপভাষা এবং উপভাষা থেকে নতুন ভাষার জন্ম
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী কালক্রমে ইন্দো-ইরানীয় হয়ে ভারতীয় আর্যভাষার তিনটি স্তর (প্রাচীন ভারতীয় আর্য, মধ্য ভারতীয় আর্য এবং নব্য ভারতীয় আর্য) অতিক্রম করে নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দে কোনো এক সময় বাংলা ভাষার জন্ম হয়। আবার কালক্রমে এই বাংলা ভাষা থেকে পাঁচটি উপভাষার জন্ম হয়— (১) রাঢ়ি (২) বরেন্দ্রী (৩) বঙ্গালি (৪) ঝাড়খণ্ডি এবং (৫) কামরূপী বা রাজবংশী।
উপভাষার জন্ম যেমন অঞ্চলের বিভিন্নতার কারণে হয়, তেমনই সামাজিক ও পেশাগত কারণেও ভাষার মধ্যে বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। শিক্ষিত সমাজের মানুষের ভাষা এবং অশিক্ষিত শ্রমজীবী মানুষদের ভাষা আলাদা। তাই সামাজিক স্তরভেদে ভাষার বৈচিত্র্যকে সমাজভাষা বলা হয়। আবার একই সমাজের বা অঞ্চলের মধ্যে বসবাসকারী সব মানুষের কথা বলার ধরন বা ভাষা ব্যবহারের ধরন এক হয় না বলে, ব্যক্তিভেদে ভাষার এই বৈচিত্র্যকে ব্যক্তিভাষা বলে।
হাতের লেখা নোট (প্রশ্নোত্তর আকারে):
৬) বাংলা ভাষা ও উপভাষার প্রধান দুটি রূপ কী কী? ৭) উপভাষা ভাষার কোন রূপ? ৮) ” ” সমাজে মূল ভাষার পার্থক্য থাকে কীসে? ৯) ভাষার লিখিত রূপে কী বলে? ১০) লিখিত রূপ ছাড়া ভাষার দ্বিতীয় রূপটি কী?
১) কেমন ভাষা থেকে উপভাষার জন্ম হয়? ২) বাংলা ভাষা থেকে কটি উপভাষার জন্ম হয়? ৩) রাঢ়ি ভাষা কোন ভাষার উপভাষা? ৫) সমাজ ভাষা কী? / শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের ভাষার বৈচিত্র্যকে কী বলে? ৬) ব্যক্তিভাষা কাকে বলে?
বাংলা ভাষাবিচিত্রা (চার্ট)
প্রায় প্রতিটি ভাষার দুটি রূপ থাকে— (১) কথ্য বা মৌখিক এবং (২) লেখ্য বা সাহিত্যিক। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও তা লক্ষণীয়। বাংলা কথ্য বা মৌখিক রূপের যেমন বৈচিত্র্য আছে, ঠিক তেমনই লিখিত রূপের দিকে তাকালেও আমরা দুটি রূপ দেখতে পাই। একটি সাধু এবং অন্যটি চলিত। বাংলা ভাষার ভাষাবৈচিত্র্যের রূপরেখা নীচে তুলে ধরা হল—
বাংলা ভাষাবিচিত্রা
|
┌───────────────┴───────────────┐
কথ্য বা মৌখিক লেখা বা সাহিতিক
| |
┌─────────┼─────────┐ ┌─────────┴─────────┐
উপভাষা সমাজভাষা ব্যক্তিভাষা পদ্য গদ্য
| | | |
┌───┼───┬────┬────┐ রাজবংশী বঙ্গালি ┌──┴──┐ ┌──────┼──────┐
রাঢ়ি বরেন্দ্রী ঝাড়খণ্ডি (বা কামরূপী) সাধু চলিত সাধু চলিত মিশ্র
|
┌─────┴─────┐
সাধু চলিত
ভাষা ও উপভাষার পার্থক্য (সারণি)
| ভাষা | উপভাষা |
|---|---|
| ১। ভাষা হল একটি বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলের ভাষাগোষ্ঠীর মানুষজনের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম। | ১। কোনো একটি বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলের ভাষাগোষ্ঠীর মানুষজনের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যমটির প্রত্যক্ষ ও ব্যবহারিক রূপ হল উপভাষা। |
| ২। একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের সবটুকু অংশেই ব্যাপ্ত হয়ে থাকে ভাষা। | ২। কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট তথা সীমাবদ্ধ এলাকায় ব্যাপ্ত থাকে উপভাষা। |
| ৩। সব উপভাষিক অঞ্চলের মানুষজনের সংযোগ-রক্ষাকারী মাধ্যম হল ভাষা। | ৩। উপভাষা হল অঞ্চল বিশেষের মানুষের মৌখিক ভাষা। |
| ৪। আদর্শ ভাষায় সাহিত্য রচিত হয়। | ৪। উপভাষায় সাহিত্যরচনা সাধারণত হয় না, তবে আঞ্চলিক চরিত্র থাকলে উপভাষা ব্যবহৃত হয়। |
| ৫। ভাষার মধ্যে অতীত ইতিহাসের উপাদান কম পরিমাণে থাকে। | ৫। উপভাষার মধ্যে ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিক উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকে। |
| ৬। মান্য তথা আদর্শ ভাষায় শিষ্টসাহিত্য রচিত হয়ে থাকে। | ৬। লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যের প্রাণস্বরূপ ভূমিকা উপভাষার। |
| ৭। ভাষা অভিজাত এবং কৃত্রিম। | ৭। উপভাষা কৃত্রিম ভাব বর্জিত এবং জীবন্ত। |
| ৮। ভাষার সঙ্গে উপভাষার বেশ খানিকটা পার্থক্য থাকলেও অন্তর্লীন যোগসূত্রটি বেশ অটুট থাকে। | ৮। ভাষার সঙ্গে উপভাষার যদি প্রচুর পার্থক্য ঘটে যায়, তখন মূল ভাষার সঙ্গে উপভাষার কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে উপভাষা স্বতন্ত্র ভাষার দাবি করে। |
ভাষা ও উপভাষার মিল বা সাদৃশ্য
(১) মূল ভাষা ও উপভাষার মধ্যে পার্থক্য আপেক্ষিক ও মাত্রাগত। কোনো ভাষার মধ্যে আঞ্চলিক রূপের পার্থক্যকে কোন স্তর পর্যন্ত উপভাষা বলা যাবে-এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই।
(২) মূল ভাষার সঙ্গে উপভাষার ধ্বনিগত, রূপগত বিষয়ে তফাত থাকলেও মূল ভাষার সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
(৩) প্রতিটি উপভাষিক অঞ্চলের মানুষকে তার নিজস্ব উপভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি মূল ভাষার সঙ্গেও পরিচিত হতে হয়।
(৪) উপভাষা ব্যবহারকারী মানুষজন লেখালিখির সময় নিজস্ব উপভাষা ব্যবহার না করে আদর্শ বা মূল ভাষাকেই অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেন।
ভাষাবৈচিত্র্য ও বাংলা ভাষা — বাংলা উপভাষা ও ভৌগোলিক অঞ্চল (চার্ট)
ভাষাবৈচিত্র্য ও বাংলা ভাষা
|
বাংলা উপভাষা ও ভৌগোলিক অঞ্চল
|
┌───────────┬────────────┬────────────┬─────────────┐
রাঢ়ি বরেন্দ্রী ঝাড়খণ্ডি কামরূপী বা বঙ্গালি
রাজবংশী
| উপভাষা | অঞ্চল |
|---|---|
| রাঢ়ি | বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ-চব্বিশ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম, উত্তর-পূর্ব মেদিনীপুর, বর্ধমান |
| বরেন্দ্রী | মালদহ, দক্ষিণ-দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া |
| ঝাড়খণ্ডি | দক্ষিণ-পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ পশ্চিম বাঁকুড়া, ধলভূম, মানভূম, সিংভূম |
| কামরূপী বা রাজবংশী | জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, শ্রীহট্ট, রংপুর, কাহাড়, ত্রিপুরা |
| বঙ্গালি | ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ, যশোর, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, কুমিল্লা |
লেখ্য বা সাহিত্যিক উপভাষা
পৃথিবীর সব ভাষার মতো বাংলা ভাষা ও উপভাষার প্রধান দুটি রূপ রয়েছে— (১) কথ্য বা মৌখিক রূপ এবং (২) লেখ্য বা সাহিত্যিক রূপ। এই লেখ্য বা সাহিত্যিক রূপটি সর্বজনবোধ্য, সর্বজনীয় আদর্শ ভাষারীতি। বাংলা ভাষার সর্বজনীন আদর্শ লেখ্য বা সাহিত্যিক উপভাষা-প্রধান দুটি ভাগ (১) পদ্য উপভাষা এবং (২) গদ্য উপভাষা।
(১) পদ্য উপভাষা: পদ্যের অপর নাম কবিতা। ছন্দোবদ্ধ পদ বা রচনাকে পদ্য বলা হয়। বাংলা লেখ্য বা সাহিত্যিক উপভাষার যাত্রা শুরু হয় পদ্যের মাধ্যমে। আদি বাংলা পর্বে বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ থেকে শুরু করে মধ্য বাংলা যুগের শেষ সাহিত্য ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য-সমস্ত সাহিত্য পদ্যে লেখা এবং আজ পর্যন্ত প্রবহমান। এই পদ্যের ভাষারীতির তিনটি রূপ পাওয়া যায়-সাধুরীতি, চলিতরীতি এবং মিশ্ররীতি (সাধু ও চলিত উভয়)।
(২) গদ্য উপভাষা: ছন্দোবন্ধহীন রচনা বা বাক্য-বিশেষকে এককথায় গদ্য বলা হয়। মধ্য বাংলা ভাষাপর্বে চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজে গদ্যের ব্যবহার হলেও সাহিত্যরচনার মাধ্যম ছিল না। পরবর্তীকালে অর্থাৎ, উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, শ্রীরামপুর মিশনের পণ্ডিতদের উইলিয়াম কেরী, রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের হাত ধরে বাংলা গদ্যের যাত্রা শুরু হয়। তারপর রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ প্রমুখ গদ্যশিল্পীদের হাতে বাংলা গদ্য সমৃদ্ধ ও উন্নত হয়ে ওঠে। আবার রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ বাংলা গদ্যে চলিতভাষা রূপটিকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। তাই বাংলা গদ্য উপভাষার প্রধান দুটি রূপ-১ সাধুভাষা এবং চলিতভাষা।
সাধুভাষা
‘সাধু’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘শিষ্ট’ বা ‘মার্জিত’। অর্থাৎ, সাধুভাষা হল মার্জিত বা শিষ্টজনের ভাষা। উনবিংশ শতকের প্রারম্ভে সংস্কৃত জানা পণ্ডিতবর্গ সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মকে অনুসরণ করে যে লেখ্য বাংলা গদ্যের প্রতিষ্ঠা করেন, তাই-ই হল সাধুভাষা। উনিশ শতকের প্রারম্ভে বাংলা গদ্যের সূচনালগ্ন থেকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র প্রমুখ সাধু গদ্যরীতিতে সাহিত্যরচনা করেছিলেন কিন্তু পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী থেকে সাধুরীতি বিদায় নেয় এবং তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলা গদ্যরূপটি চলিতভাষা রীতিতে রচিত হয়ে চলেছে।
সাধুভাষার বৈশিষ্ট্য:
(১) সাধুভাষায় তৎসম অর্থাৎ সংস্কৃত শব্দের বহুল ব্যবহার রয়েছে। মৃগ, তৃণ, পিতা, রজনী ইত্যাদি।
(২) সাধুভাষায় দীর্ঘ সন্ধিবদ্ধ পদ এবং সমাসবদ্ধ পদের সংখ্যা অধিক। যেমন- যৎপরোনাস্তি, বাষ্পবারিবিন্দু ইত্যাদি।
(৩) সাধুভাষায় সর্বনাম পদের প্রাচীন ও পূর্ণাঙ্গ রূপ ব্যবহার করা হয়। যেমন- যাহাদের, আমাদিগের ইত্যাদি।
(৪) সাধুভাষায় ক্রিয়াপদের প্রাচীন এবং পূর্ণাঙ্গ রূপের ব্যবহার রয়েছে। যেমন- পড়িতেছিলাম, বলিয়া থাকিব।
(৫) সাধুভাষায় যৌগিক ক্রিয়াপদের যথেষ্ট ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন- গমন করা, দৃশ্যমান হওয়া ইত্যাদি।
(৬) অব্যয়পদের প্রাচীন রূপ- তথাপি, নচেৎ এবং অনুসর্গের প্রাচীন ও দীর্ঘ রূপ-অপেক্ষা, নিমিত্ত ইত্যাদি বহুল ব্যবহার করেছে।
(৭) সাধুভাষায় দীর্ঘ, যৌগিক এবং জটিল বাক্যের যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে।
চলিতভাষা
‘চলিত’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘প্রচলিত’ বা ‘চালু’। জনগণের মুখের প্রচলিত ভাষা চলিতভাষা। তবে চলিতভাষা শুধু যে-কোনো অঞ্চলের জনগণের মুখের ভাষা নয়। বাংলা চলিত ভাষারীতির মূল ভিত্তি হল রাঢ়ি উপভাষার আদর্শ কথ্যরূপ। ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, দুই চব্বিশ পরগনার শিক্ষিত জনগণের মান্য কথ্যভাষার আদলে যে বাংলা লেখ্য ভাষারীতিকে গ্রহণ করা হয়েছে, তাকে চলিতভাষা বা আদর্শ চলিতভাষা বলা হয়। বাংলা গদ্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, বিবেকানন্দ প্রমুখের হাতে চলিত রূপটি যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে চলিতভাষা বাঙালির লেখা ও বলার একমাত্র ভাষা হয়ে উঠেছে।
চলিতভাষার বৈশিষ্ট্য:
(১) চলিতভাষায় তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ, গুরুগম্ভীর অপ্রচলিত শব্দ পরিত্যাগ করে তদ্ভব, অর্ধতৎসম শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। যথা-হাত, আজ, গিন্নি ইত্যাদি।
(২) চলিতভাষায় দেশি, বিদেশি এবং প্রাদেশিক শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। যেমন- ডোবা, ঢাকা, পেন, টেবিল ইত্যাদি।
(৩) চলিতভাষায় সর্বনাম পদের সংক্ষিপ্ত ব্যবহার রয়েছে। যেমন- আমাদের, যারা ইত্যাদি।
(৪) কম চলিতভাষায় ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্ত রূপ লক্ষণীয়, যথা-পড়ছি, করে ইত্যাদি।
(৫) এখানে যৌগিক ক্রিয়ার ব্যবহার নেই বললেই চলে। যথা- শয়ন করা > শোয়া, আহার করা > খাওয়া ইত্যাদি।
(৬) চলিতভাষায় অব্যয়পদের সরলরূপ দেখা যায়। যথা-তথাপি > তবুও, অদ্যপি > এখনও ইত্যাদি।
(৭) চলিতভাষায় অনুসর্গের সংক্ষিপ্ত রূপের ব্যবহার রয়েছে। যেমন-চেয়ে, জন্য, থেকে ইত্যাদি।
সাধু ভাষা ও চলিত ভাষা (সারণি)
| সাধু | চলিত |
|---|---|
| ১। বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়াপদ ইত্যাদির রূপ দীর্ঘ। | ১। বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়াপদ ইত্যাদির রূপ হ্রস্ব। |
| ২। পদবিন্যাসের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ক্রিয়াপদটি বাক্যের শেষে বসে। | ২। পদবিন্যাসের নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। |
| ৩। উচ্চারণভঙ্গি বিলম্বিত। | ৩। উচ্চারণভঙ্গি দ্রুত। |
| ৪। সন্ধি ও সমাসের আধিক্য। | ৪। সন্ধি ও সমাসকে ভেঙে সহজ করে লেখা হয়। |
| ৫। তৎসম শব্দের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। | ৫। তৎসম শব্দের পাশাপাশি তদ্ভব, বিদেশি, দেশি, অর্ধ-তৎসম শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। প্রয়োজন না হলে সাধারণত তৎসম শব্দ ব্যবহৃত হয় না। |
| ৬। বিভিন্ন প্রত্যয়ান্ত শব্দ, সমাসবদ্ধ শব্দ প্রভৃতি প্রয়োগ করা হয়। | ৬। ধ্বন্যাত্মক শব্দ, অনুকার শব্দ, বাগধারা এবং বিশিষ্টার্থক শব্দের প্রয়োগ বেশি। |
| ৭। সংস্কৃত অব্যয়ের ব্যবহার প্রচুর। | ৭। সাধারণত সংস্কৃত অব্যয়ের তদ্ভব রূপ ব্যবহৃত হয়। |
| ৮। অনুসর্গগুলি সাধারণত তৎসম প্রধান, অনুসর্গগুলির রূপও দীর্ঘতর। | ৮। অনুসর্গ হিসেবে তৎসম এবং অর্ধ-তৎসম—সবরকমের শব্দই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। |
MCQ প্রশ্নোত্তর (উত্তর বোল্ড করা হয়েছে):
প্রশ্ন ১: কোনো একটি বিশেষ ভাষার বিভিন্ন রূপকে বলে— A) উপভাষা B) আদর্শ ভাষা C) ভাষাবৈচিত্র্য ✓ D) ভাষা কাঠামো
প্রশ্ন ২: ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে বলে— A) উপভাষা ✓ B) কৃত্রিম ভাষা C) মান্যভাষা D) আদর্শ ভাষা
প্রশ্ন ৩: ভাষা মানুষের— A) লেখা প্রকাশের মাধ্যম B) ভাব প্রকাশের মাধ্যম ✓ C) সামাজিক মাধ্যম D) অঙ্গভঙ্গির মাধ্যম
প্রশ্ন ৪: ভাষার মাধ্যমে কেবল মাত্র ভাব প্রকাশ করে— A) পশুপাখি B) মানুষ ✓ C) পণ্ডিতরা D) ভাষাবিদরা
প্রশ্ন ৫: ভাষা হল— A) ধ্বনি বা ধ্বনির সমষ্টি ✓ B) বাক্য বা বাক্যের সমষ্টি C) অক্ষর বা অক্ষরের সমষ্টি D) পদ বা পদগুচ্ছর সমষ্টি
প্রশ্ন ৬: উপভাষা হল ভাষার কোন রূপ? A) লিখিত রূপ B) বাহ্যিক রূপ C) ব্যাবহারিক রূপ ✓ D) সব ক-টি
প্রশ্ন ৭: উপভাষা হল ভাষার অন্তর্গত— A) কৃত্রিম রূপ B) লিখিত রূপ C) বিশেষ বিশেষ রূপ ✓ D) লুপ্ত রূপ
প্রশ্ন ৮: উপভাষার সঙ্গে মূল ভাষার পার্থক্য থাকে— A) বর্ণগত B) ধ্বনিগত, রূপগত, বাক্তারাগত ✓ C) লিপিগত D) কৃত্রিম ভাষাগত
প্রশ্ন ৯: ভাষা ও উপভাষার মধ্যে পার্থক্যটা খুবই— A) বেশি B) কম ✓ C) অধিক D) কৃত্রিম
প্রশ্ন ১০: ভাষা ও উপভাষার মধ্যে সম্পর্কটা— A) আপেক্ষিক/তুলনামূলক ✓ B) কৃত্রিম C) উচ্চারণগত D) লিপিগত
প্রশ্ন ১১: আধুনিক বাংলা ভাষার কয়টি উপভাষা রয়েছে? A) তিনটি B) চারটি C) পাঁচটি ✓ D) ছয়টি
প্রশ্ন ১২: বর্তমানে বাংলা উপভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপভাষা হল— A) বঙ্গালি B) রাঢ়ি ✓ C) বরেন্দ্রী D) রাজবংশী
প্রশ্ন ১৩: বর্তমানে বাংলা পাঁচটি উপভাষা বাংলা ভাষার যে স্তরে সৃষ্টি হয়েছে, সেটি হল— A) নব্য বাংলা স্তরে ✓ B) প্রাচীন বাংলা স্তরে C) আদি-মধ্য বাংলা স্তরে D) অন্ত্য-মধ্য বাংলা স্তরে
প্রশ্ন ১৪: বাংলার কেন্দ্রীয় উপভাষা হল— A) বরেন্দ্রী B) ঝাড়খণ্ডি C) কামরূপী D) রাঢ়ি ✓
প্রশ্ন ১৫: কামরূপী উপভাষার অপর নাম— A) বরেন্দ্রী B) কামুক C) রাজবংশী ✓ D) চিত্রকূট


